কৃষি খাতে নানা ভর্তুকি, প্রণোদনা, বরাদ্দ ও প্রকল্পে খরচ করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তবে সেই টাকার সুফল প্রান্তিক চাষিরা পাচ্ছেন কিনা-তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। প্রান্তিক চাষিদের অভিযোগ, তদারকি ও জবাবদিহিতা না থাকায় অনেক সময় প্রকৃত কৃষকরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পদে পদে হয়রানির মুখেও পড়ছেন তাঁরা। অনেক ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের পছন্দের লোক, রাজনৈতিক নেতা কিংবা বড় উদ্যোক্তা। কখনও কখনও প্রণোদনার টাকা বা সামগ্রী যথাযথ বণ্টন না করে নয়ছয়েরও অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে মাঠ পর্যায়ের একটি চক্রের ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে আছেন ক্ষুদ্র চাষিরা।

অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি উপকরণের বাড়তি দর ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গেও লড়ছেন চাষি। জ্বালানি তেল ও সারের দাম বাড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে চরম সংকটে কৃষি খাত। এছাড়া উত্তরাঞ্চলসহ অনেক এলাকায় এবার আগের বছরের চেয়ে বৃষ্টি কমেছে ৮৯ শতাংশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধরনেও রয়েছে অঞ্চলভিত্তিক এমন ভিন্নতা। অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সেটা বিবেচনায় না নেওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে বৈষম্যও দেখা দেয়। এ প্রেক্ষাপটে চাষিদের সার্বিক সুবিধা দিতে অঞ্চলভিত্তিক বাজেট প্রণয়নে কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, কৃষিকে এগিয়ে নিতে ভর্তুকি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনিয়ম দূর করতে জোরদার করতে হবে তদারকি।

সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ৮৭টি। সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ 'সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ' প্রকল্পে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল মেয়াদের এ প্রকল্পের আওতায় তিন হাজার ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২ খাতে ৫১ হাজার ৩০০টি কৃষিযন্ত্র বিতরণের কাজ চলছে।

যন্ত্রে সরকার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। তবু উচ্চ দরের যন্ত্রপাতির ব্যবহার এখনও অধিকাংশ কৃষকের নাগালের বাইরে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাবে তা ১০ শতাংশের কম। ডিএই জানায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের আওতায় ২০৮ কোটি টাকা খরচে সারাদেশে প্রায় দুই হাজার ৩০০টি কৃষিযন্ত্র কৃষকের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। তবে এসব যন্ত্র বিতরণে রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও প্রকৃত চাষির হাতে যাচ্ছে না যন্ত্র। কিছু ক্ষেত্রে বরাদ্দের যন্ত্র উধাও হওয়ারও ঘটনা ঘটেছে।

যেভাবে অনিয়ম: গত ৯ জানুয়ারি নওগাঁ ডিএইয়ের উপপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগে বদলগাছীর বৈকুণ্ঠপুর গ্রামের আশরাফুল ইসলাম জানান, বদলগাছীতে ১০টি পাওয়ার থ্রেসার মেশিন বরাদ্দ হয়। নিজের নামে বরাদ্দ আসার পর আশরাফুল ইসলাম উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করলে কৃষি কর্মকর্তা জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন করা ওয়ার্কশপ থেকে কিনতে হবে। জেলায় ৮০টির মতো পাওয়ার থ্রেসার মেশিন তৈরির ওয়ার্কশপ থাকলেও মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনভুক্ত। এগুলো হলো পত্নীতলার নজিপুর বাজারের এমআর ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ এবং ভাই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ। প্রতিষ্ঠান দুটির মালিক সম্পর্কে চাচা-ভাতিজা এবং পত্নীতলা কৃষি অফিসের এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার আত্মীয়। আশরাফুল ওই দুই ওয়ার্কশপে যোগাযোগ করলে পাওয়ার থ্রেসার মেশিনের দাম চাওয়া হয় ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। অথচ সরকারের ভর্তুকি দরে এর দাম ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। এদিকে একই মানের পাওয়ার থ্রেসার মেশিন অন্য ওয়ার্কশপগুলোতে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

২০২০ ও ২০২১ সালে কিশোরগঞ্জ সদরের দানাপাটুলি ইউনিয়নে ১৩টি ধান কাটার যন্ত্র দেওয়া হয়। কৃষি বিভাগের শর্ত অনুযায়ী দুই বছরের মধ্যে এগুলো কেউ বিক্রি করতে পারবে না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, একটি যন্ত্রও এখন নেই। বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা তা বিক্রি করে দিয়েছেন। দানাপাটুলি ইউনিয়নের কয়েকজন কৃষক বলেন, তাঁদের ইউনিয়নে দু-তিনটি যন্ত্র হলেই যথেষ্ট। অথচ সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩টি।

এদিকে কর্তৃপক্ষের সঠিক নজরদারি, দক্ষ জনবলের অভাব ও কেন্দ্র সংগঠকদের অবহেলায় কোনো কার্যক্রম নেই দেশে কৃষি তথ্য যোগাযোগ কেন্দ্রগুলোতে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যন্ত্রপাতি। এ ব্যাপারে কৃষি তথ্য সার্ভিসের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর টাকার অভাবে সেগুলো চালিয়ে নেওয়া যায়নি।

কৃষি আবহাওয়া প্রকল্পও একই পথে: বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পরিচালিত কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্পেরও একই হাল। সম্প্রতি প্রকল্পের কার্যক্রম ও অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে কৃষি মন্ত্রণালয়। দেশের ৬৪ জেলার ৪৯২ উপজেলার চার হাজার ৫৫৪ ইউনিয়ন পরিষদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। ২১২ কোটি ৩৬ লাখ টাকার এ প্রকল্প ২০২৩ সালের জুনে শেষ হবে। এরমধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল ১৫ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় অটোমেটিক রেইন গজ এবং কৃষি আবহাওয়া ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন, ৪৮৭ উপজেলায় কিওস্ক স্থাপন ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের আবহাওয়াবিষয়ক তথ্য পাঠানোর জন্য ইন্টারনেট কানেকটিভিটিসহ ৬ হাজার ৬৬৪টি ট্যাব সরবরাহ করা হয়। আবহাওয়ার তথ্য হালনাগাদ করার জন্য তথ্য বোর্ড স্থাপন করা হয়েছিল পরিষদ চত্বরের দর্শনীয় স্থানে। কার্যক্রম চালানোর জন্য উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী ছয় দিনের আবহাওয়ার হালনাগাদ তথ্য এই বোর্ডে থাকার কথা। সরেজমিন দেশের অন্তত ২০ ইউনিয়নে দেখা গেছে, অযত্ন-অবহেলায় বেশিরভাগ যন্ত্র এখন অকেজো। কোথাও কোথাও যন্ত্রের মধ্যে দেখা গেছে পাখির বাসা। এ সেবা সম্পর্কে জানেন না চাষিও।

টিআইবির জরিপেও অনিয়মের চিত্র: কৃষি খাতের আরও বেশকিছু প্রকল্পেও রয়েছে একই রকম অব্যবস্থাপনা। গত আগস্টে প্রকাশিত টিআইবির এক জরিপে উঠে এসেছে কৃষি খাতের অনিয়মের চিত্র। জরিপে ১৫ হাজার ৪৫৪টি খানা (পরিবার) অংশ নেয়। ওই জরিপে বলা হয়, সার্বিকভাবে কৃষিতে সেবা নেওয়া খানাগুলোর মধ্যে ২৪.৪ শতাংশ কোনো না কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হয়েছে; ৪.৯ শতাংশ খানাকে সেবা পেতে ঘুষ দিতে হয়েছে। গড়ে ঘুষ গুনতে হয়েছে ২৬৬ টাকা। এ ছাড়া ৯.৫ শতাংশ তথ্য দিতে অসহযোগিতা, ৭.৬ শতাংশ স্বজনপ্রীতি, ৬ শতাংশ ব্লক সুপারভাইজারদের পরামর্শ সময়মতো পাননি। জেলা কিংবা উপজেলা কৃষি অফিসে দুর্নীতির শিকার হয়েছে সবচেয়ে বেশি ৩১.৯ শতাংশ। ঘুষ দেওয়া খানার হার ডিলারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ১২.৮ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞ মত: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমএ সাত্তার মন্ডল বলেন, দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। ফলে তাঁরা কী চান সেটি বুঝতে হবে নীতিনির্ধারকদের। সে অনুসারে নিতে হবে পদক্ষেপ।

গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার মোস্তফা বলেন, শুধু সার কিংবা কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি সীমাবদ্ধ না রেখে কৃষিপ্রধান অঞ্চলগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করতে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সমষ্টিগত সহায়তা দেওয়ার পথ খুঁজতে হবে।

মন্ত্রী যা বললেন: কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কৃষকদের কখনোই অবহেলা বা বঞ্চনার মধ্যে থাকতে দিচ্ছে না সরকার। তাঁদের সবসময়ই উৎপাদনশীল ও বাণিজ্যিকভাবে লাভবান করতে সব ধরনের আর্থিক ও নীতিসহায়তা জোরদার করা হয়েছে। কৃষকের জন্য যা যা করা দরকার সব করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ভর্তুকিসহ নানা রকম প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে। তবে সেবা দিতে গাফিলতি কিংবা অনিয়ম-দুর্নীতি হলে সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।