পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে খুন হয় জিয়াউল হক। ১৯৯৪ সালে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার আগুয়া গ্রামের এই কিশোর হত্যা মামলায় ২২ বছর পর হয় বিচারিক আদালতে রায়। রায়ে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড হলেও উচ্চ আদালতে তা টেকেনি। ১২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স খারিজ ও চার আসামিকে খালাস দেন। আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কারাগারে অন্য আসামি মারা যান।

হাইকোর্টের রায়ের পর আসামি পক্ষের আইনজীবী হেলাল উদ্দিন মোল্লা বলেন, হত্যাকাণ্ড দেখেছেন এমন সাক্ষী নেই। বিচারিক আদালতের রায়েও বলা ছিল কেউ মারতে দেখেনি। যুক্তিসংগত সন্দেহ থেকে উচ্চ আদালত আসামিদের খালাস দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন। তবে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এসএম আশরাফুল হক জর্জ বলেন, আসামিরা বাড়ি থেকে জিয়াউলকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর সে আর ফেরেনি। পরদিন লাশ মেলে। মামলায় এটিই তো বড় এভিডেন্স, যা বিবেচনায় নিয়ে বিচারিক আদালত আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছিলেন।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর আরেক মামলায় হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স খারিজ করে দুই আসামিকে খালাস দেন। ২০০১ সালে রংপুরের পীরগাছার কৈকুড়ি ইউনিয়নের নজরমামুদ গ্রামের কৃষক মাহাতাব হোসেন খুন হন। নিহতের ভাই আবু বক্কর সিদ্দিক চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। দীর্ঘদিন বিচারকাজ চলার পর ২০১৬ সালে রংপুরের বিশেষ জজ আদালত মানিক মিয়া ও হাসান আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেন, যে রায় উচ্চ আদালত বাতিল করেন।

এভাবে বিচারিক আদালতের বেশিরভাগ মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিরা উচ্চ আদালতে এসে খালাস পাচ্ছেন। ফলে বিচারিক আদালতের রায় নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। আইনজ্ঞরা বলছেন, একটি মামলার মূল ভিত্তি হলো পুলিশি তদন্ত। নানা কারণে সেখানে ফাঁকফোকর থেকেই যাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তাজনিত কারণে সঠিক ব্যক্তি সাক্ষ্য দিচ্ছেন না কিংবা দুর্বল সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে বিচারিক দক্ষতার ঘাটতি, বিচার-বিশ্নেষণের অভাবসহ নানা সীমাবদ্ধতায় অধস্তন আদালত থেকে অনেক ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ রায় হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে চাঞ্চল্যকর মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। ফলে মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ রায় শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে এসে চুলচেরা বিশ্নেষণে টিকছে না।

সাম্প্রতিক এক পরিসংখানে দেখা গেছে, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের ৭০ ভাগ মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পাওয়া আসামিরা উচ্চ আদালতে এসে খালাস পেয়েছেন। যদিও গত এক বছরে হাইকোর্টে কতটি ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি হয়েছে এবং সাজা বহাল রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন দিতে পারেনি। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে বলা থাকে, মৃত্যুদণ্ডাদেশের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের অনুমোদন নিতে হবে। এটি সংবিধিবদ্ধ আইন। রায়ে নিম্ন আদালত কী ভুলত্রুটি করেছেন, সেসব চুলচেরা বিশ্নেষণের মাধ্যমে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্কের ভিত্তিতে রায় দেন হাইকোর্ট। এ ক্ষেত্রে অনেক মামলায় সাজা বহাল থাকে, আবার ক্ষেত্র বিশেষে সাজা কমে বা বাতিল করে আসামিকে খালাস দেন উচ্চ আদালত। যদিও হাইকোর্টের রায়ই চূড়ান্ত নয়।
বিচারিক আদালতে সর্বোচ্চ সাজা পাওয়া ব্যক্তির উচ্চ আদালতে নির্দোষ কিংবা সাজা কমে যাওয়ার বিষয়ে মিশ্র মতামত দিয়েছেন আইনজীবীরা। ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন দেশে মৃত্যুদণ্ডের রায় কমলেও আমাদের এখানে বিচারিক আদালতে ঢালাওভাবে ফাঁসির আদেশ হচ্ছে। এমনও দেখা গেছে, এক ব্যক্তি হত্যায় ১০-১২ জন মৃত্যুদণ্ড পাচ্ছেন। এমন রায় হাইকোর্টে এসে প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে।

আইনজ্ঞদের ভাষ্য, অনেক হত্যা মামলায় পুলিশি তদন্ত সঠিকভাবে হয় না, পক্ষপাত করে দায়সারা প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এমনকি প্রভাবশালী আসামিদের ভয়ে ও নিরাপত্তার কারণে অনেক সাক্ষী আদালতে আসেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুর্বল সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে রায় দেন বিচারিক আদালত, যা স্বাভাবিকভাবে উচ্চ আদালতে গিয়ে টিকছে না। আবার বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া এক ধরনের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। বিচারকরা ভেবেই নেন, উচ্চ আদালতে তো ফয়সালা হবেই। এ জন্য যেনতেন করে একটি রায় তাঁরা দিয়ে দেন। এতে মামলার উভয়পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আইনজীবীরা বলছেন, আইন ও সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়ে বিচারিক আদালত যতদিন 'খেয়ালি রায়' দেওয়া বন্ধ না করবে, ততদিন উচ্চ আদালতে এসে মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলার আসামিরা খালাস পেয়েই যাবেন। এ জন্য দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি আইনের মূলনীতিগুলোর যথাযথ প্রয়োগ দাবি করেন তাঁরা।

বিচারিক আদালতে কারও মৃত্যুদণ্ড হলে নিয়ম অনুযায়ী সেটি অনুমোদনে হাইকোর্টে পাঠানো হয়, যেগুলোকে ডেথ রেফারেন্স মামলা বলা হয়। বর্তমানে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি ও শুনানির জন্য সাতটি বেঞ্চ রয়েছে। হাইকোর্টেই এখন প্রায় ৮০০ ডেথ রেফারেন্স মামলা রয়েছে।

এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন সমকালকে বলেন, উচ্চ আদালতে চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা শুনানির সময় চুলচেরা বিশ্নেষণ হয়। আইনের কোনো বিচ্যুতি যেন না ঘটে, সেদিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত দেন বিচারপতিরা। নির্দোষ ব্যক্তি যেন বিনা অপরাধে শাস্তি না পান, সেটি উচ্চ আদালতকে নিশ্চিত করতে হয়। এ জন্য অনেক মামলায় বিচারিক আদালতে এক ধরনের রায় হলেও উচ্চ আদালতে এসে বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার পান।

ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এসএম শাহজাহান সমকালকে বলেন, বিচারকের কাজ হলো প্রতিটি মামলা গুরুত্ব বিবেচনায় বিচার করে রায় দেওয়া। ঢালাও কিংবা খামখেয়ালিভাবে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে কখনোই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। মামলার এজাহার, তদন্ত, অভিযোগপত্র ও সাক্ষ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট মেরিট (উপাদান) থাকতে হবে। অন্যথায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া সম্ভব হবে না।

ঢাকা মহানগর আদালতের পিপি আব্দুল্লাহ আবু সমকালকে বলেন, সঠিকভাবে সাক্ষ্যগ্রহণ না হলে মামলা দুর্বল হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে আদালতের কিছুই করার থাকে না। এ জন্য বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মামলার আইনগত ক্রটি-বিচ্যুতি রোধে আদালত ও প্রসিকিউশনকে আরও মনোযোগী হতে হবে। আর এটি করা গেলে, আশা করি বিচারিক আদালতের রায়ই উচ্চ আদালতে বহাল থাকবে।