পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের করতোয়া নদীতে নৌকাডুবিতে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আট শিশু ও ১২ নারী রয়েছেন। এ ঘটনায় এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অর্ধশত যাত্রী। রোববার দুপুরের দিকে মহালয়া উদযাপনে পুণ্যার্থীরা ধর্মসভায় যোগ দিতে নদী পার হওয়ার সময় আউলিয়ার ঘাট এলাকায় এই নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী ছিলেন ওই নৌকায়।
নৌকার মাঝি ছাড়া নিহত সবাই হিন্দু সম্প্রদায়ের। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন উদ্ধারকর্মীরা। ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। খোলা হয়েছে জরুরি তথ্যকেন্দ্র। রাত ৯টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত উদ্ধারকাজ চলছিল।
মর্মান্তিক নৌকাডুবিতে ২৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের করতোয়া নদীর অন্য পাড়ে বরদেশ্বরী মন্দিরে মহালয়া পূজা উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো ধর্মসভার আয়োজন করা হয়। গতকাল দুপুরের দিকে মূলত ওই ধর্মসভায় যোগ দিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নৌকাযোগে নদী পার হচ্ছিলেন। তবে ৫০ থেকে ৬০ জনের ধারণক্ষমতার নৌকাটিতে দেড় থেকে ২০০ যাত্রী ছিলেন। অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে নদীর মাঝপথে নৌকাটি ডুবে যায়। অনেকে সাঁতরে তীরে আসতে পারলেও সাঁতার না জানা, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা ডুবে মারা যান। এ পর্যন্ত ২৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, খরস্রোতের কারণে নিখোঁজ অনেকের লাশ ভেসে যেতে পারে।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন- পলি রানী (১৪), লক্ষ্মী রানী (২৫), অমল চন্দ্র (৩৫), শোভা রানী (২৭), দীপঙ্কর (৫), প্রিয়ান্তা রানী (৫), খুকি রানী (৩৫), প্রলিমা রানী (৫৫), তারা রানী (২৪), শোনেকা রানী (৬০), ফাল্কগ্দুনী রানী (৫৫), প্রমীলা রানী (৭০), ধনবালা (৪৭), সুমিত্রা রানী (৫৭), সফলতা রানী (৪০), শিমলা রানী (৩৫), উশোষী রানী (২), তনুশ্রী রানী (২), শ্রেয়শী রানী (২), বিমল চন্দ্র (৪৫), শ্যামলী রানী (৩৫), জোতিষ চন্দ্র (৫৫), রূপালী রানী (৩৫) ও নৌকার মাঝি হাসান আলী (৫২)। তাঁদের মধ্যে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা নদী থেকে ১৬ জনের লাশ উদ্ধার করেন এবং বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নেওয়ার পথে আরও আটজন মারা যান। তাঁদের বাড়ি জেলার বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়।
স্বজনের খোঁজে অনেকেই নদীর পাড়ে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। শোকার্তদের আহাজারি চলছে বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও।
ঘটনার পর জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সফিকুল ইসলামসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বোদা উপজেলার মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়ন পরিষদে জরুরি তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়েছে। লাশ শনাক্তসহ যে কোনো প্রয়োজনে ০১৭০৮-৩৯৭৭১৮ ও ০১৭১৯-৩৪৭১৭৩ এই নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। নিহত প্রত্যেক পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে।
নৌকাডুবির পর বেঁচে ফেরা যাত্রী মাড়েয়া বামনপাড়া এলাকার সুবাস চন্দ্র রায় বলেন, 'নৌকায় দেড়শরও বেশি যাত্রী ছিলেন। আমরা ওঠার পরপরই নৌকায় পানি ঢুকতে শুরু করে। এ সময় মানুষজন নৌকার মধ্যেই হড়াহুড়ি শুরু করে। পরে যে পাশেই যাচ্ছিলাম, সে পাশেই নৌকায় পানি ঢুকছিল। আমরা পাঁচ বন্ধু সাঁতার কেটে তীরে ফিরে প্রাণে বেঁচে যাই। অন্য যাত্রীরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে বাঁচার আকুতি করছিলেন। তবে এত মানুষ মারা যাবে, বুঝতে পারিনি।'
নদীপাড়ে আসা এক বৃদ্ধ বলেন, 'আমার ছেলে ও শ্যালকের স্ত্রীর লাশ পাওয়া গেছে। শ্যালককে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, তাঁর অবস্থা ভালো না।'
ঘটনাস্থলে থাকা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পঞ্চগড় স্টেশনের সহকারী উপপরিচালক শেখ মাহবুবুল ইসলাম বলেন, 'আমাদের ডুবুরি দলের সদস্যরা উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।'
রংপুর বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক মো. জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি ডুবুরি দল উদ্ধার তৎপরতায় যোগ দিয়েছে। এ ছাড়া নীলফামারী, সৈয়দপুর ও লালমনিরহাটের ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার কাজে অংশ নিচ্ছেন।
বোদা থানার ওসি সুজয় বলেন, গত দু'দিন এখানে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। ফলে উজানের ঢলে নদীর পানি বেড়ে যায়। আর নৌকাটি ডুবেছে মাঝনদীতে। তাতেই প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। উদ্ধারকাজ চলছে। ঘটনা তদন্তে কমিটি হয়েছে।