প্রায় ১৫ ঘণ্টা নির্বাক ছিলেন ফরিদপুর থেকে উদ্ধার হওয়া খুলনার আলোচিত রহিমা বেগম। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ, পিবিআই ও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি ছিলেন চুপচাপ। রোববার দুপুরে মরিয়ম মান্নানসহ ৫ সন্তানের সঙ্গে সাক্ষাত ও কথা বলার পর মুখ খোলেন রহিমা বেগম। পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন)- এর কাছে দাবি করেন, তাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তবে তার জবানবন্দি নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে।

দৌলতপুর থানা পুলিশ জানায়, শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামের আবদুল কুদ্দুস মোল্লার বাড়ি থেকে রহিমা বেগমকে উদ্ধার করা হয়। এরপর রাত ২টার দিকে তাকে দৌলতপুর থানায় আনা হয়।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) ডেপুটি কমিশনার (নর্থ) মোল্লা জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, গাড়িতে করে আনার সময় কীভাবে নিখোঁজ হয়েছিলেন এবং ২৮ দিন কোথায় কোথায় ছিলেন সে প্রশ্ন করা হয়েছিল রহিমা বেগমকে। কিন্তু তিনি কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দেননি। রাতে থানায় আনার পর প্রশ্ন করলেও তিনি নিশ্চুপ ছিলেন। রাত আড়াইটার দিকে দৌলতপুর থানায় বসে সাংবাদিকরা রহিমা বেগমের নিখোঁজ থাকার বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করলে তখনও তিনি চুপচাপ ছিলেন।

ভোর ৫টা থেকে পরদিন বেলা পৌনে ১১টা পর্যন্ত রহিমা বেগমকে সোনাডাঙ্গা থানার ভেতরে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখা হয়। সেখানে সকালে তার মেয়ে মরিয়ম মান্নান ও ছেলে মো. সাদীসহ ৫ সন্তান দেখা করতে যান। দূর থেকে তাদের সঙ্গে দেখা হলেও তখন কোনো কথা হয়নি। বেলা পৌনে ১১টার দিকে রহিমা বেগমকে পিবিআই কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু তখনও তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।

দুপুর ১২টার দিকে প্রেস ব্রিফিংয়ে পিবিআই খুলনার পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, ‌‘রহিমা বেগম নিখোঁজ হওয়ার পর বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও মুকসুদপুর ঘুরে ১৭ আগস্ট ফরিদপুরে কুদ্দুস মোল্লার বাড়িতে যান। কুদ্দুস মোল্লা আগে খুলনার একটি পাটকলে চাকরি করতেন। তখন রহিমার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন তিনি। ৭ দিন ওই বাড়িতে ছিলেন রহিমা।’

তিনি বলেন, ‌‌‘রহিমার কাছ থেকে একটি শপিং ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। ব্যাগের মধ্যে ওড়না, হিজাব, আয়না, শাড়ি, চোখের ড্রপ, ব্যবহৃত সালোয়ার কামিজ ও ক্রিম ছিল। স্বাভাবিকভাবে কাউকে অপহরণকারীরা নিয়ে গেলে এই জিনিসগুলো তার সঙ্গে থাকার কথা না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এটা অপহরণ নাও হতে পারে।’

পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘গত কয়েক দিন মরিয়ম মান্নান ফেসবুকে অনেক পোস্ট দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন। জানি না কেন তিনি এটা করেছেন। একটি সোর্স থেকে শুনেছি রহিমা তার ছেলেমেয়ে ও স্বামী কারও সঙ্গেই দেখা করতে চান না এবং কারও কাছেই যেতে চান না।’

প্রেস ব্রিফিংয়ের পর পুলিশ সুপারের কক্ষে অসংখ্য সাংবাদিক রহিমা বেগমের কাছে জানতে চান এই ২৮ দিন তিনি কোথায় ছিলেন, কেমন ছিলেন। প্রায় ৬-৭ মিনিট ধরে সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করলেও তিনি মুখ খোলেননি।

দুপুর দেড়টার দিকে পুলিশ সুপারের কক্ষে রহিমা বেগমের সঙ্গে দেখা করেন তার মেয়ে মরিয়ম মান্নান, আদুরি আকতার, ছেলে মো. সাদীসহ ৫ সন্তান। এ সময় মেয়েরা মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এরপর পুলিশ সদস্যরা ওই কক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বাইরে যাওয়ার অনুরোধ করলে সাংবাদিকরা বাইরে বেরিয়ে আসেন। তখন রহিমা বেগম কিছু সময় তার সন্তানদের সঙ্গে কথা বলেন। দীর্ঘ ১৫ ঘণ্টা নির্বাক থাকার পর পিবিআই পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান ও অপহরণ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর আবদুল মান্নানের কাছে মুখ খোলেন রহিমা বেগম। 

পুলিশ সুপার বলেন,‌ ‘রহিমা দাবি করেছেন, গত ২৭ আগস্ট রাতে তিনি বাড়ির সামনে পানি আনতে গেলে ৩-৪ জন তার নাকে কিছু একটা দিয়ে অজ্ঞান করে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু কোথায় নিয়ে যায় তা তিনি বলতে পারেন না। অনেক দূরে কোথাও নিয়ে যায়। নেওয়ার পরে অনেকগুলো ব্লাঙ্ক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়। তখন সেখানে যাদের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ সেই গোলাম কিবরিয়া ও মহিউদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। তারা তাকে বলে যে, তোকে প্রাণে মারলাম না, মারলে তো মার্ডার কেস খাব। সেজন্য ছেড়ে দিলাম।’

পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘ছেড়ে দেওয়ার পর হাঁটতে হাঁটতে মনি নামে এক মেয়ের সঙ্গে দেখা হয় এবং তার বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। সেখানে কিছুদিন ছিলেন, তারপর তাদের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা নিয়ে একদিন-একরাত বাসে চড়ে তারপরে মুকসুদপুরে যান। সেখান থেকে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে কুদ্দুস মোল্লার বাড়িতে যান। রহিমার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি ফেসবুকে দেখে ওই এলাকার এক যুবক স্থানীয় ইউপি সদস্যকে জানান। ইউপি সদস্য বিষয়টি মোবাইলে দৌলতপুরের ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে জানান। কাউন্সিলর দৌলতপুর থানার ওসিকে জানালে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে আনে।

কেন তিনি খুলনায় না এসে ফরিদপুর গেলেন এবং কেন সন্তানদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেননি- সে প্রশ্নের উত্তরে রহিমা পুলিশ সুপারকে জানান, ‌‘খুলনায় আসেননি ভয়ে। আর নিজের কোনো মোবাইল না থাকায় এবং সন্তানদের মোবাইল নম্বর মুখস্থ না থাকায় যোগাযোগ করতে পারেননি।’

পুলিশ সুপার বলেন, ‘রহিমার দাবি তার ওপর যখন হামলা হয় তখন তার স্বামী দোতলা থেকে তাকিয়ে দেখছিলেন। তখন রহিমা তার স্বামীকে বলেন যে, তোমাকে ওরা মেরে ফেলবে তুমি তাড়াতাড়ি ঘরের মধ্যে যাও। তখন তার স্বামী ঘরে গিয়ে দরজা দেয়।’

তিনি জানান, রহিমার স্বামী বেলাল এ মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছে। তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

বাড়ির সামনে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা রয়েছে, পেছনের বাড়িতেও ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা রয়েছে। তাহলে ধরে নিয়ে যাওয়ার চিত্র কেন ক্যামেরাতে ধরা পড়েনি- এ প্রশ্নের উত্তরে রহিমা বলেছেন, ‘তাকে অজ্ঞান করে ফেলেছিল। সে কারণে এ সম্পর্কে তিনি বলতে পারেন না।’

পুলিশ সুপার বলেন, ‘এটি আসলেই অপহরণ কিনা তা তদন্ত করে দেখা হবে। এ মামলায় এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার ৬ জন কারাগারে রয়েছে। তাদের সাতদিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়েছে। তবে এখনও শুনানির দিন ধার্য হয়নি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তদন্ত শেষ হলে বলা যাবে তাদের মধ্যে কেউ অপরাধী আছে, নাকি সবাই নিরাপরাধ।’

পুলিশ সুপার জানান, বিকালে রহিমা বেগমকে মহানগর হাকিম আদালতে পাঠানো হয়। ২২ ধারায় তার জবানবিন্দ রেকর্ড করেন আদালত। এছাড়া রহিমাকে আশ্রয় দেওয়া কুদ্দুস মোল্লার ছেলে আলামিন, কুদ্দুসের স্ত্রী ও তার ভাইয়ের স্ত্রীকে দৌলতপুর থানা পুলিশ আটক করেছিল। তাদের দুপুরে পিবিআই এর কাছে হন্তান্তর করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে অপহরণ মামলায় আটক মহিউদ্দিন ও গোলাম কিবরিয়ার বড় ভাই নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘উদ্ধারের পর রহিমা বেগম দীর্ঘ সময় কেন চুপ ছিলেন? তার মেয়ে মরিয়মকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে। রহিমা বেগম যে জবানবন্দি দিয়েছেন তা বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর।’

নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রহিমা বেগমের তিন বিয়ে। মেয়ের ঘটকালি করতে আসে বেলাল, সর্বশেষ রহিমা বেগম তাকে বিয়ে করেন। তিনি বলেন, তার ছোট ভাই গোলাম কিবরিয়া রহিমার সৎ ছেলের কাছ থেকে জমি কেনেন। সেই জমিতে যাতে যেতে না পারে সেজন্য আত্মগোপন করে অপহরণ মামলা দিয়ে তাকে আটক করিয়েছে।’

তিনি দাবি করেন, ‘মরিয়ম মান্নান নাটকবাজ। পুলিশ ও সাংবাদিকদের মিথ্যা কথা বলে প্রায় এক মাস বিভ্রান্ত করেছেন। তিনি মাদকাসক্ত। ময়মনসিংহে গিয়েও মরিয়ম নাটক সাজায়।’

তিনি আটককৃতদের মুক্তি এবং রহিমা বেগম ও তার পরিবারের সদস্যদের শাস্তির দাবি জানান।