টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে বাঁশতৈল পুলিশ ফাঁড়ির হাজতখানা থেকে আটক এক ব্যক্তির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। হাজতখানার ভেন্টিলেটরের সঙ্গে সাদা রঙের নাইলনের রশিতে ঝুলছিল মরদেহটি। মৃতের নাম লেবু মিয়া (৫০)। তিনি বাঁশতৈল গ্রামের বাহার উদ্দিনের ছেলে। তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে। তবে প্রাথমিকভাবে পুলিশ একে আত্মহত্যা বলে দাবি করেছে।

জিজ্ঞাসাবাদের নামে ব্যাপক মারধর করে হত্যা করা হয়েছে- এমন অভিযোগে সখীপুর-গোড়াই সড়কের বাঁশতৈল এলাকায় টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন এলাকাবাসী। এ ঘটনায় দায়িত্বরত কনস্টেবল সুব্রত সাহাকে টাঙ্গাইল পুলিশ লাইনে সরানো হয়েছে। এছাড়া তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

সোমবার গভীর রাতে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এর আগে লেবু মিয়ার গ্রাম বাঁশতৈলতে সোমবার সখিনা আক্তার নামের এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি মফিজুর রহমানের (৪৭) প্রাক্তন স্ত্রী। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মফিজুর রহমান ও লেবু মিয়াকে আটক করেছিল পুলিশ। 

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় আট বছর আগে সখিনা বেগমের সঙ্গে বাঁশতৈল গ্রামের মফিজুর রহমানের (৪৭) বিয়েবিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে তিনি একই গ্রামে আলাদা বাড়ি তৈরি করে দুই মেয়ে ও ছেলেকে নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। মেয়েদের বিয়ে হওয়ায় প্রবাসী ছেলের স্ত্রীকে নিয়ে ওই বড়িতে থাকতেন তিনি। রোববার রাতে সখিনা বাড়িতে একা ছিলেন। এরপর সোমবার সকালে তিনি ঘুম থেকে না ওঠায় পাশের বাড়ির লোকজন খোঁজ করতে গিয়ে তার লাশ দেখতে পান। খবর পেয়ে মির্জাপুরের বাঁশতৈল ফাঁড়ির পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। তার পরিবারের দাবি, সখিনাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় সখিনার ভাই বাদী হয়ে মির্জাপুর থানায় মামলা করেন। সেই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সখিনা বেগমের সাবেক স্বামী মফিজুর ও প্রতিবেশী লেবুকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। 

লেবু মিয়ার স্ত্রী আলেয়া বেগম বলেন, আমার স্বামীকে বিনা অপরাধে পুলিশ আটক করে নিয়ে যায়। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। রাতে তাকে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে। আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য ইদ্রিস আলী অভিযোগ করে বলেন, বাঁশতৈল ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) সেলিম তাকে আটক করে নিয়ে যান। পরে তাকে বেধড়ক মারপিট করা হয়। এক পর্যায়ে তার মৃত্যু হয়। পরে পুলিশ আত্মহত্যার নাটক সাজাচ্ছে। আমরা হত্যার বিচার চাই।

লেবু সিকদারের ভাতিজা সাদ্দাম হোসেন বলেন, আমার চাচাকে দিনের বেলায় ফাঁড়ির পুলিশ সাখাওয়াত হোসেন ও নেছার উদ্দিন ডেকে নিয়ে যান। মঙ্গলবার সকাল দশটায় চাচার মুত্যুর খবর পাই। কিন্তু ফাঁড়ি থেকে আমাদেরকে চাচার মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি।

মির্জাপুর বাঁশতৈল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সাখাওয়াত হোসেন জানান, ফাঁড়িতে কাউকে নির্যাতন করা হয়নি। যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা মিথ্যা ও বানোয়াট।

টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) শরফুদ্দীন জানান, মির্জাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল ইসলাম বুলবুলের উপস্থিতিতে মরদেহটি ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নিচে নামানো হয়। পরে তিনি মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। তবে হাজতখানার ভেতরে রশি কোথা থেকে এলো এ নিয়ে তদন্ত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। 

মির্জাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল ইসলাম বুলবুল জানান, হাজতখানার ভেতরে ভেন্টিলেটরের সঙ্গে সাদা রঙের নাইলনের রশি দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় লেবু মিয়ার মরদেহ দেখা যায়। নিহতের গলায় রশির কালো দাগ ছাড়া আর কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার বলেন, দায়িত্বরত কনস্টেবলকে পুলিশ লাইনে সরানো হয়েছে হয়েছে। এ ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মীর মনির হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, সখিপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার রাকিবুর রাজা ও পুলিশ পরিদর্শক (অপরাধ) সুব্রত কুমার সাহা। আগামী তিনদিনের মধ্যে তাদেরকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।