পাহাড়কন্যা রাঙামাটির পর্যটন বলতে ঐতিহাসিক সেই একটি ঝুলন্ত সেতু ও শুভলং ঝরনায় সীমাবদ্ধ ছিল। দুই থেকে তিন যুগ ধরে পাহাড়ে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছে মূল আকর্ষণ ছিল এ সেতুই। কিন্তু গত কয়েক বছরে পুরোপুরি পাল্টে গেছে সেই চিত্র। পাহাড়ের প্রশাসন ও ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে পর্যটন শিল্পে। যত দিন যাচ্ছে ততই বিকশিত হচ্ছে পাহাড়ের পর্যটন এলাকা। কিন্তু রাঙামাটিকে পর্যটনের সত্যিকারের রানীতে রূপ দিতে পাবর্ত্য জেলা পরিষদ এক হাজার ২০০ কোটি টাকার একটি ড্রিম প্রজেক্ট হাতে নিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। পার্বত্য অঞ্চলজুড়ে অসংখ্য পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে পর্যটন করপোরেশন, তবে কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়ন করতে পারেনি। পাহাড়ের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে পর্যটন শিল্পের বিকাশ রয়ে গেছে সেই তিমিরেই। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আগ্রহ নেই পর্যটন মন্ত্রণালয়ের চিন্তাধারায়ও। পাহাড়ে পর্যটন করপোরেশনের পর্যটন বিকাশ তিন হোটেল-মোটেলেই বন্দি রয়েছে। পাহাড়ের তিন জেলায় তিনটি মোটেল ছাড়া পর্যটন করপোরেশনের আর কোনো প্রকল্প নেই।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ডেপুটি ম্যানেজার (পরিকল্পনা) শিপ্রা দে বলেন, দেড়শ কোটি টাকা ব্যয়ে রাঙামাটি ঐতিহাসিক ঝুলন্ত সেতু পুনর্নির্মাণ একটি প্রকল্প, বান্দরবানের ডিমপাহাড় পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণে জমি সংগ্রহসহ অনেক পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু করোনার কারণে এসব প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া যায়নি। পর্যটন করপোরেশনকে নিজেদের আয় দিয়ে নিজেদের চলতে হয়। সরকার থেকে আমরা কোনো অর্থ বরাদ্দ পাই না। তাই আমাদের নতুন প্রকল্প হাতে নিতে বহু চিন্তাভাবনা করতে হয়।

বিডি ট্রাভেলার্সের পরিচালক জিয়াউল হক বলেন, পৃথিবীর ২১টি দেশ ভ্রমণ করেছি। আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ে যে প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, তা পৃথিবীর খুব কম দেশেই দেখেছি। পর্যটন মন্ত্রণালয় কিংবা পর্যটন করপোরেশনের শুধু ইচ্ছার অভাবের কারণে পাহাড়ের পর্যটন শিল্পের বিকাশ হচ্ছে না। কারণ, সরকারের বাজেট আছে। সুন্দর ও সঠিক পরিকল্পনা করে তা খরচ করার সৃজনশীল মানুষ নেই বলেই মনে হচ্ছে।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের জনসংযোগ কর্মকর্তা অরুণেন্দু ত্রিপুরা বলেন, সরকারের পরামর্শে রাঙামাটির পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশে 'এক্সক্লুসিভ পর্যটন জোন' তৈরি করতে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে নকশা ও খসড়াসহ ১২শ কোটি টাকার বাজেট ধরা হয়েছিল। কিন্তু প্রজেক্টটি পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর তা পাস হয়নি। এটি বাস্তবায়ন হলে পৃথিবীতে রাঙামাটির পর্যটন বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে উঠত।

উদ্যোগ অনেক, বাস্তবে নেই একটিও :প্রতিবছর রাঙামাটির দৃষ্টিনন্দন ঝুলন্ত সেতু দেখতে যান দুই থেকে তিন লাখ পর্যটক। তাই দ্বিতল মোটেল থেকে চারতলার আধুনিক পর্যটন মোটেল তৈরি করা হয়েছে রাঙামাটি হলিডে পর্যটন কেন্দ্রে। পাহাড়কে ঘিরে পর্যটকদের আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে তিন পার্বত্য জেলাকে ঘিরে নানা পর্যটন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন (বিপিসি)। রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতুটির আধুনিকায়নে দেড়শ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়। একইভাবে বান্দরবানের থানচির সাঙ্গু নদীর পাড়ে নয়নাভিরাম ডিমপাহাড় ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করে বিপিসি। বান্দরবান জেলা প্রশাসকের কাছে খাসজমি বরাদ্দও চায়। খাগড়াছড়ির রিসাং ঝরনাসহ একাধিক বিনোদন স্পটকে ঘিরেও পর্যটন কেন্দ্র তৈরির সম্ভাব্যতা যাচাই করে বিপিসি। ২০১৭ সালে বিপিসি 'পার্বত্য জেলাগুলোতে বিনোদন সুবিধা প্রবর্তন, সম্প্রসারণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি স্টাডি প্রকল্প' নামে এক কোটি টাকার একটি জরিপ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। পাহাড়কে ঘিরে পর্যটনের উদ্যোগ যাচাই-বাছাই করে 'প্রকল্প উপদেষ্টা লিমিটেড' নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু জরিপকাজ শেষ হলেও পর্যটন করপোরেশন থেকে পাহাড়ের পর্যটনের বিকাশে কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়ন করা হয়নি।

তিন মোটেলেই বন্দি পর্যটন করপোরেশন :পাহাড়ে পর্যটন করপোরেশনের পর্যটন বিকাশ তিন মোটেলেই বন্দি রয়েছে। রাঙামাটিতে একটি চারতলা ও দ্বিতল পর্যটন মোটেল রয়েছে। এছাড়া বান্দরবানে মেঘলায় তিন তলার একটি মোটেল রয়েছে। খাগড়াছড়ির চেঙ্গী নদীর পাড়ে তিনতলাবিশিষ্ট একটি পর্যটন মোটেল রয়েছে পর্যটন করপোরেশনের।

এ সংস্থার রাঙামাটির ব্যবস্থাপক সৃজন বিকাশ বড়ূয়া বলেন, রাঙামাটি ঘুরতে আসা পর্যটকদের জন্য ২০১৪ সালে এসি-ননএসি ৩৯ রুমের চারতলা ভবনের একটি আধুনিক পর্যটন মোটেল চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া দ্বিতল মোটেলে ২১টি কক্ষ রয়েছে। এর মাধ্যমেই আমরা পর্যটকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। খাগড়াছড়ির তিন তলাবিশিষ্ট পর্যটন মোটেলে রয়েছে এসি-ননএসি ২৭টি কক্ষ। বান্দরবান পর্যটন মোটেলে ৪২টি এসি-ননএসি কক্ষ রয়েছে। এ তিনটি মোটেল ছাড়া পাহাড়ে আর কোনো নতুন পর্যটন কেন্দ্র সৃষ্টি কিংবা উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেনি পর্যটন করপোরেশন।

বিষয় : পাহাড়ে পর্যটন

মন্তব্য করুন