দেশের অধস্তন আদালতে মামলাজট নিরসনে সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন যখন একের পর এক কৌশল নির্ধারণে হিমশিম খাচ্ছে, তখন শতভাগ মামলা নিষ্পত্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ময়মনসিংহ বিভাগের আদালতগুলো। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিভাগের চার জেলার আদালতগুলোয় দায়ের হওয়া মামলা নিষ্পত্তির পরও পুরোনো প্রায় ৪ হাজার মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে।
প্রশাসনিক সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ফলে ময়মনসিংহ বিভাগে এবার মামলা নিষ্পত্তির হার বেড়েছে।

বিভাগের চার জেলা- ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও জামালপুরে বিভিন্ন পর্যায়ের ১০৯টি আদালত রয়েছে। বিভাগের একাধিক বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা সমকালকে জানিয়েছেন, প্রশাসনিক তৎপরতা ও মামলার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ফলে মামলাজট কমেছে।

সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ময়মনসিংহ বিভাগে মামলা হয়েছে ৪৭ হাজার ৯০৪টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৫১ হাজার ৮১১টি। অর্থাৎ ৩ হাজার ৯০৭টি পুরোনো মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর বিভাগওয়ারি মামলাজট নিষ্পত্তিতে এমন চিত্র আর দেখা যায়নি। তবে ২০১৪ সালে পাইলট প্রকল্পের আওতায় সোয়া লাখ মামলা নিষ্পত্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জের জেলা আদালত।

বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা জানান, মামলা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে মনিটরিং কমিটির দিকনির্দেশনা এবং বিচারকদের সদিচ্ছার ফলেই চার জেলার সব আদালতেই মামলা নিষ্পত্তি বেড়েছে। এটি অব্যাহত রাখতে হলে মামলা ব্যবস্থাপনার সব পর্যায়ে ডিজিটাইজেশনের পাশাপাশি জনবল সংকটসহ যেসব সমস্যা রয়েছে তা সমাধান করা প্রয়োজন।
জানতে চাইলে বার কাউন্সিলের রিলিফ কমিটির চেয়ারম্যান ও ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি জালাল উদ্দিন খান সমকালকে বলেন, প্রশাসনিক তৎপরতা ও মামলা ব্যবস্থাপনার কারণে শতভাগ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর সঙ্গে আইনজীবীদের ভূমিকাও ছিল অনস্বীকার্য।

সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হয় বিচার বিভাগকে। তখন দেশের নিম্ন আদালতে বিচারাধীন ছিল ১৫ লাখ ৭০ হাজার মামলা। এর সংখ্যা বেড়ে গত ৩০ জুন পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ৩৬ লাখ ৬৩ হাজার ৫। অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫৪৮টি মামলা। সব মিলিয়ে দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৫৩।

মামলাজট নিরসনে বহুদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আইন কমিশন এর আগে ২৭ দফা সুপারিশ দিয়েছিল। তবে মূল সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান কোনো অগগ্রতি নেই। আইন কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, আদালতে যে পরিমাণ মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে, সে অনুযায়ী দায়েরের সংখ্যা কমছে না। এ জন্য মামলা অনুপাতে বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো এবং ফৌজদারিসহ বেশ কিছু আইন ও বিদ্যমান কয়েকটি আইনের ধারা সংশোধনেরও প্রস্তাব করা হয়েছিল। প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী গত ১ জানুয়ারি শপথের মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরদিন আপিল বিভাগে তাঁকে দেওয়া আইনজীবীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি মামলাজট কমাতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধান বিচারপতি ২৭ জানুয়ারি আট বিভাগের জন্য হাইকোর্ট বিভাগের আটজন বিচারপতির নেতৃত্বে পৃথক মনিটরিং কমিটি গঠন করেন। ময়মনসিংহ বিভাগের আদালত মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. জাকির হোসেনকে।

আদালত ও আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য মামলা দায়ের, নোটিশ জারি, নকল প্রাপ্তিসহ সর্ব ক্ষেত্রেই ব্যাপক সংস্কারমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। বিচারে অহেতুক হস্তক্ষেপ রোধ, ধার্য তারিখে মামলার শুনানি গ্রহণ ও সাক্ষীকে আদালতে হাজিরের ক্ষেত্রে আগে থেকেই নোটিস জারি এবং ওই নোটিস পৌঁছেছে কিনা, তাও তদারকি করেন সংশ্নিষ্ট বিচারকরা। এসব সংস্কারমূলক কার্যক্রমের ফলে মামলা নিষ্পত্তিতে অগ্রগতি হয়েছে।

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বলেন, প্রধান বিচারপতি অধস্তন আদালতে মামলা দায়ের ও নিষ্পত্তির বিষয়টি তদারকির জন্য পৃথক মনিটরিং কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। এর সুফল আসতে শুরু করেছে।

বিষয় : মামলা নিষ্পত্তির রেকর্ড

মন্তব্য করুন