১৯৯০ সালে সহকারী তহশিলদার হিসেবে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যোগ দিয়েছিলেন আব্দুল মালেক। ১৯৯৮ সালের এপ্রিলে তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। ছুটির দরখাস্ত দিয়ে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার উনঞ্চুরকী গ্রামের বাড়িতে আসেন তিনি। মেয়ের চিকিৎসার জন্য বছরখানেক ধরে দেশের নানা হাসপাতালে মালেককে ছোটাছুটি করতে হয়। কর্মস্থলে দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে ওই বছরের ১২ আগস্ট তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে মালেকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়। বিষয়টি জানতে পেরে কর্মস্থলে গেলে তাঁকে সেখানে ঢুকতে দেননি কর্মকর্তারা।

মালেকের অভিযোগ, সাময়িক বরখাস্ত করার আদেশের কপিও তাঁকে দেওয়া হয়নি। বেশ কয়েকবার ওই কার্যালয়ে ধরনা দিয়েও কাজ না হওয়ায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ সংশ্নিষ্ট দপ্তরগুলোয় একাধিকবার লিখিত আবেদন করেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। পরে সহকারী মোহরার হিসেবে কাজ শুরু করেন গাবতলী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। এখানে স্বল্প আয়ে চালাচ্ছিলেন পাঁচ সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সাজানো সংসার।

কিন্তু বিধি বাম! ২০২১ সালের মার্চ মাসে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দিনাজপুর কার্যালয়ে দায়ের হওয়া খাজনার ৩৮ হাজার টাকা আত্মসাতের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় আব্দুল মালেককে। দুই মাস হাজতবাসের পর দিনাজপুর আদালত থেকে জামিনে ছাড়া পান। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ২০১৩ সালে তাঁর বিরুদ্ধে ওই মামলা করে দুদক।

বর্তমানে এ মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি দুদক দিনাজপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী আব্দুল আজিজ সরকার বলেন, আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে করা মামলার বিষয়টি কয়েক দিন আগে জানতে পারলাম। গত ১২ সেপ্টেম্বর এক আদেশে দিনাজপুরের বিশেষ জজ আদালত এ বিষয়ে দুদকের কাছে প্রতিবেদন চেয়েছেন। আমরা সময় নিয়েছি।

জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী খোরপোশসহ পাওনাদি না পাওয়ায় গত ৩ মার্চ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করেন আব্দুল মালেক। কমিশন বিষয়টি আমলে নিয়ে তাঁকে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর অভিযোগের পরামর্শ দেয়। তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি লিখিতভাবে জানান। দিনাজপুরের জেলা প্রশাসককে গত ২৯ জুন ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোছাম্মৎ মমতাজ বেগমের সই করা চিঠিতে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ রবিউল করিম খান গত ২১ আগস্ট ফোন করে আব্দুল মালেককে তাঁর কার্যালয়ে ডাকেন। সেখানে মালেকের বক্তব্য শোনার পর চাকরি থেকে তাঁকে স্থায়ী বরখাস্ত করা হয়েছে বলে মৌখিকভাবে জানিয়ে দেন। তবে এ-সংক্রান্ত আদেশের কোনো কাগজ দেখাননি তিনি। মালেকের অভিযোগ, এ সময় চাকরির ৯ বছরে যেসব পাওনা রয়েছে, সেসব বিষয়ে তাঁকে কিছুই জানানো হয়নি। নবাবগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিমেষ সোম বলেন, তাঁর কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই।

আব্দুল মালেক বলেন, 'আমি চাকরি ফেরত কিংবা সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী খোরপোশ ও ভাতা পেতে ১৯৯৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত দিনাজপুর জেলা প্রশাসক, নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এসিল্যান্ড ও বিভাগীয় কমিশনার বরাবর একাধিকবার লিখিত আবেদন করেছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। অবশেষে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আবেদন করি। পোস্ট অফিসের মাধ্যমে পাঠানো পত্রগুলোর একনলেজমেন্ট (এডি) সংরক্ষণে রেখেছি। বছর পর বছর হয়রানি করায় আমি এক প্রকার হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম। তবে আমাকে গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি আদালতে ওঠে। সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, আব্দুল মালেককে নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারি ভাতা ও খোরপোশ আটকে দেওয়া হয়েছে। তাঁর সঙ্গে চরম অন্যায় করা হয়েছে।

দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ রবিউল করিম খান সমকালকে বলেন, আব্দুল মালেককে বরখাস্ত-সংক্রান্ত কাগজপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের মামলারও বিচার চলছে। তবে মালেকের আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হয়তো আবেদনের কপি সংশ্নিষ্টদের নজরে পড়েনি। আবেদনটি ফাইলে চাপা পড়ে থাকায় সমাধানও হয়নি।

লিগ্যাল এইডের প্যানেল আইনজীবী রঞ্জিত কুমার দুর্নীতির মামলায় মালেকের পক্ষে লড়ছেন। তিনি বলেন, মালেকের বিরুদ্ধে ৩৮ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা ও বরখাস্ত করা হয়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাঁর সঙ্গে যা হয়েছে, তা অন্যায়। তিনি ২৩ বছর ধরে অফিসে অফিসে ঘুরেছেন। কিন্তু তাঁর অভিযোগ কেউ আমলে নেননি। আদালতে তিনি ন্যায়বিচারের জন্য লড়ছেন।