বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারি অফিসের সময় পরিবর্তন করা হয়েছে এক মাস আগে। নতুন সূচি অনুযায়ী সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত অফিসে থেকে কর্মকর্তাদের সেবা দেওয়ার কথা। তবে সরকারের নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে বস্তবায়নের চিত্র নাজুক। সূচি অনুযায়ী কর্মকর্তারা অফিসে না এলেও চলে যান নতুন নিয়মেই। গত রোববার ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা পরিষদে অবস্থান করে দেখা গেছে সরকারি দপ্তরগুলোর ঢিলেঢালা কার্যক্রম।

সকাল সোয়া ৮টার দিকে সমাজসেবা অফিসের তালা খোলেন অফিস সহায়ক আবুল কাশেম। তখনও কর্মকর্তা আসেননি। আবুল কাশেম বলেন, গ্রামের লোকজন তাদের অফিসে সেবা নিতে আসেন। কিন্তু সকালে কেউ আসেন না। ৯টা ৫০ মিনিটে কার্যালয়ে আসেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মিজানুল ইসলাম আকন্দ, চলে যান ৩টা বাজতেই। তিনি বলেন, পাশের উপজেলা গৌরীপুরের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকায় সেখানে যান। তিনি থাকেন ময়মনসিংহ শহরের বাসায়।
সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় খোলেন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, কর্মকর্তা ছুটিতে রয়েছেন। বৃষ্টির কারণে অফিসে আসতে দেরি হয়েছে। সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সানোয়ার রাসেল জানান, তিনি এক দিনের ছুটিতে। তবে অফিস যথাসময়ে খোলার কথা।

উপজেলায় প্রথম কর্মকর্তা হিসেবে হাজির হন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আনার কলি নাজনীন। সকাল ৮টা ৩৩ মিনিটে নিজ কার্যালয়ে প্রবেশ করেন তিনি। ৮টার কিছু পর মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঝাড়ু দিতে দেখা যায় এক নারীকে। ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে কার্যালয়ে প্রবেশ করেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেনকে। তিনি বলেন, পরীক্ষা থাকায় শনিবারও দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় আসতে বিলম্ব হয়েছে। তিনি বাস করেন ময়মনসিংহ শহরে। তখনও আসেননি উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার আবু হানিফা মো. আসাদুজ্জামান। বেলা সোয়া ১১টার দিকে একাডেমিক সুপারভাইজারকে অফিসে আসার জন্য ফোন করেন মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। পরে এলেও বেলা ২টার দিকে চলে যান। তিনি বলেন, পায়ে সমস্যা থাকায় চলে যাচ্ছেন। উপজেলা কৃষি অফিসও খোলা হয় সকাল ৮টা ২০ মিনিটের পর।

৮টা ২৮ মিনিটে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে পাওয়া যায় এক সেবাগ্রহীতাকে। তখনও অফিসে তালা ঝুলছে। এক কর্মকর্তাকে ফোন করে অপেক্ষা করার কথা জানাচ্ছিলেন যুবক আসাদুজ্জামান। তিনি ১৬ কিলোমিটার দূরের আঠারবাড়ি এলাকা থেকে এসেছেন। তিনি বলেন, তাঁকে সকাল ৭টায় আসতে বলা হয়েছিল। এক মাসের একটি প্রশিক্ষণে পাঠানো হবে তাঁকে। কিন্তু সকাল ৯টার পর লোকজন আসে।

সকাল ৮টা ৪৯ মিনিটের দিকে অফিসে আসেন অফিস সহায়ক নবী মিয়া। তাঁর কাছে ছিল না অফিসের চাবিও। বিলম্বে আসার কারণ জানতে চাইলে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন তিনি। বলেন, 'পারলে চাকরি খায়ালাইন।' সকাল থেকে অপেক্ষা করলেও উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা একেএম আবদুল কাদির ভূঞা দুপুরে মোবাইল ফোন রিসিভ করেন। তিনি বাস করেন কিশোরগঞ্জের নিজ বাড়িতে। তিনি বলেন, শনিবারও কাজ থাকায় কর্মক্ষেত্রে যান। তাই রোববার যাননি। অফিসে না আসার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ বলেননি তিনি।

৮টা ২৪ মিনিটেও তালা দেওয়া ছিল সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়ে। পৌনে ৯টার দিকে হাজির হন দুই অফিস সহকারী। তাঁরা জানান, কর্মকর্তা নিবেদিতা কর ছুটিতে রয়েছেন। তিনিও ময়মনসিংহ শহরের বাসা থেকে এসে অফিস করেন। সমবায় কর্মকর্তা বলেন, পুজোর কারণে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ছুটিতে থাকবেন। তবে অফিস দেরিতে খোলার বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন।

সকাল ৮টা ২৪ মিনিটের দিকে উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের তালা খোলেন অফিস সহকারী। মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ফাতেমাতুজ জোহোরা আসেন সাড়ে ৯টার দিকে। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়। তিনিও কর্ম এলাকায় না থেকে ময়মনসিংহ শহরে থাকেন। মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা বলেন, ৮টা থেকে অফিস শুরু হলেও সেবাগ্রহীতারা আসেন না। সে কারণে তাঁরাও একটু দেরিতে আসেন। সময়সূচি পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন। তিনি বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় সময় মতো তাঁরা হাজির হতে পারেন, তাই বাইরে থাকলেও সমস্যা নেই।

উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান কিশোরগঞ্জ থেকে এসে অফিস করেন। রোববার সকাল ১০টার পর অফিসে এলেও চলে যান ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে। তিনি বলেন, কর্মস্থলে কেউ থাকে না। দেরিতে আসা ও আগে চলে যাবার বিষয়ে তিনি কথা বলতে চাননি। আনসার-ভিডিপি কর্মকর্তার কার্যালয়ও খোলা হয় সকাল ৯টার পর। কর্মকর্তা সুশান্ত মোদক ছুটিতে রয়েছেন।

উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় খোলা হয় সাড়ে ৮টার দিকে। সাড়ে ৯টার পর অফিসে আসেন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, জেলা অফিসে কাজ সেরে আসতে দেরি হয়েছে। তবে যত সময় হোক কাজ শেষ করেই যেতে হবে।

বেলা ১০টা ৪৯ মিনিটে কার্যালয়ে যান বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) কর্মকর্তা নীলিমা নূপুর ঝিনুক। কিছুক্ষণ থাকার পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা হল রুমে একটি অনুষ্ঠান শেষে বেলা ১টার কিছু পর চলে যান। তাঁর কার্যালয়ের এক কর্মী বলেন, 'ম্যাডাম অসুস্থ থাকায় বাসায় চলে গেছেন।' ৩টার কিছু আগে বিআরডিবি কর্মকর্তাকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, সকালে একটি সমিতি ঘুরে অফিসে যেতে দেরি হয়। দুপুরে চলে যান ইউনিয়নে পূজাম প পরিদর্শনে। মুভমেন্ট রেজিস্টার আছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, সময় মতো তা লিপিবদ্ধ করেন।

উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা নেই অন্তত দেড় বছর ধরে। এ পদে চলতি দায়িত্ব পালন করেন পরিসংখ্যান তদন্তকারী সারোয়ার আলম। বেলা ১১টায় অফিসে আসেন তিনি। ১১টা ২৩ মিনিটে কার্যালয়ে প্রবেশ করে দেখা যায় কম্পিউটারে 'নাগীন' সিরিয়াল দেখছেন তিনি। সারোয়ার আলম সমকালকে বলেন, তিনি নান্দাইলের বাসা থেকে এসে অফিস করেন। বেলা সাড়ে ৯টায় এসেছেন। তবে জাটিয়াতে ফিল্ড ভিজিটে গিয়েছিলেন। মুভমেন্ট রেজিস্টারের বিষয়ে তিনি বলেন, এসব তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। বেলা ২টায় চলে যান তিনি।

উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়েও সকাল ৯টা পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা আসেননি। শিখা নামে এক নারীকর্মী কক্ষগুলো পরিস্কার করছিলেন। উপজেলা প্রকৌশলী তৌহিদ আহমেদ সজল বলেন, সকালে সাইট ভিজিট শেষে অফিসে এসেছেন। তাঁদের কাজের ভলিয়ম অন্যদের সঙ্গে মিলবে না।
উপজেলা পরিষদে সেবা নিতে হাফিজুল ইসলাম এসেছেন ২০ কিলোমিটার দূরের ভাটিরচর নওপাড়া থেকে। বেলা ৩টার দিকে পরিষদ চত্বরে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ৪টা পর্যন্ত অফিস চলে জানতেন। কিন্তু সময় কমেছে জানেন না। জন্মনিবন্ধন সংশোধনের জন্য এসেছিলেন তিনি।
যুব উন্নয়ন অফিসে তারুন্দিয়া থেকে এসেছেন আবু সালিম। এই যুবক বলেন, অফিসের সময় আগেরটাই ভালো ছিল। মাইজবাগের হারুয়া গ্রামের মঞ্জিলা খাতুন এসেছেন মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে। বাড়ির কাজ শেষ করে আসতে ৩টা বেজে গেলেও তাঁর কাজ হয়েছে।

অফিস সময় প্রসঙ্গে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান একেএম ফরিদ উল্লাহ বলেন, নতুন সূচি কেউ মানছেন না। এ নিয়ে কথা বললে অফিসারদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়বে। সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বলেন, কর্মকর্তারা এলাকায় না থাকায় সঠিক সময়ে উপস্থিত হতে পারেন না। মাসিক সমন্বয় সভায় আলোচনা করে কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে থাকতে বলা হয়েছিল।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজা জেসমিন রবি ও সোমবার ছুটিতে ছিলেন। কর্মকর্তাদের বিলম্বে আসা প্রসঙ্গে মোবাইল ফোনে তিনি সমকালকে বলেন, সরকারি নতুন সূচি মেনে সকল কর্মকর্তাকে দায়িত্ব পালন করতে সভায় একাধিকবার বলা হয়েছে। তিনি ছুটিতে আছেন এটি সবাই জানেন, এ সুযোগে তাঁরা এমনটি করতে পারেন। কর্মকর্তাদের কর্ম এলাকায় থাকা উচিত।


বিষয় : ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ

মন্তব্য করুন