বাণিজ্যিক ভবনের আড়ালে আগেই ঢাকা পড়েছে কুষ্টিয়া শহরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কুষ্টিয়া হাই স্কুল। স্কুলের চারপাশে মার্কেট ও স্কুলভবন নির্মাণ করতে একটি পুকুর ভরাট করা হয়। এবার শেষ পুকুরটির ওপরও কালো থাবা পড়েছে পরিচালনা পর্ষদ ও স্কুলের প্রধান শিক্ষকের।

জানা গেছে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রাতের বেলায় জলাধারটি ভরাট করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই বড় অংশ ভরাট করা শেষ হয়েছে। সেখানে নতুন করে বাণিজ্যিক ভবন করা হবে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গভীর রাতে শুরু হয় ট্রাকের আসা-যাওয়া। এক ডাম্প ট্রাক বালু ফেলার পর কিছু সময় বিরতি। এরপর আবারও এক ট্রাক ভরে বালু এনে ফেলা হচ্ছে পুকুরে। এভাবে রাতভর বালু ফেলে গোপনে ভরাট করা হচ্ছে স্কুলের পুকুরটি। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অমান্য করে পুকুর ভরাট করায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন পরিবেশকর্মী, সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও স্কুলটির প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।

অভিযোগের তীর স্কুলটির প্রধান শিক্ষক খলিলুর রহমান ও একটি প্রভাবশালী মহলের দিকে। দোকানপাটসহ নানা স্থাপনা নির্মাণের জন্য পুকুরের অর্ধেকের বেশি অংশ ভরাট করে ফেলেছেন তাঁরা। সরেজমিন দেখা গেছে এ চিত্র। এর আগে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে অনিয়ম, দোকান বরাদ্দ দিয়ে কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।

দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির নেতা ও স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী এস এম কাদেরী শাকিল বলেন, প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার সঙ্গে আঁতাত করে পুকুরটি ভরাট করে মার্কেট তৈরির পরিকল্পনা করছেন প্রধান শিক্ষক। যে কারণে রাতের আঁধারে চুপিচুপি ভরাটকাজ চালাচ্ছেন তাঁরা। কোনোভাবেই জলাধার ভরাট করার বিধান নেই। তাঁরা আইন না মেনে ব্যক্তিস্বার্থে এসব অপকর্ম করছেন। বিশেষ করে খলিল প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর স্কুলটি ধসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে। স্কুলটি বাঁচাতে সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন।

পুকুরটি ১৯৯০ সালের দিকে খনন করা হয়। এর আয়তন এক বিঘার বেশি। মাছ চাষ করা ছাড়াও বর্ষার সময় আশপাশের পানি এ জলাধারে পড়ত। আগে একটি পুকুর ভরাট করায় এটিই টিকে ছিল কোনোরকমে। এটিও ভরাট করলে পরিবেশ বিপন্ন হবে বলে মনে করেন সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি রফিকুল আলম টুকু। পুকুরটি রক্ষার দাবিও জানান তিনি।

এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক খলিলুর রহমান বলেন, বড় পুকুর হলে পরিবেশের ছাড়পত্র নিতেন। ছাড়পত্র না নিয়েই ভরাটের কাজ করছেন। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার পরামর্শে তিনি পুকুর ভরাট করছেন বলে জানান।

কুষ্টিয়া হাই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ডাক্তার এ কে এম মুনির বলেন, পুকুরটি স্কুলের মধ্যেই রয়েছে। খেলার মাঠ করার জন্যই এটি ভরাট করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য- এটি পুকুর নয়; আগের সভাপতি মাছের পোনা চাষ করার জন্য খনন করেছিলেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার উপপরিচালক মোহাম্মদ আতাউর রহমান বলেন, প্রাকৃতিক বা মানুষ সৃষ্ট জলাশয় ভরাট করার কোনো সুযোগ নেই। যদি ভরাট করতে হয় অবশ্যই নিয়ম মেনে অনুমতি নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কুষ্টিয়া হাই স্কুলের পুকুর ভরাটের জন্য অনুমতি নেওয়া হয়নি। প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুষ্টিয়া জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রমজান আলী আকন্দ বলেন, নানা অনিয়মে জর্জরিত কুষ্টিয়া হাই স্কুল। স্কুলটি নিয়ে তাঁরা মহা বিপদে রয়েছেন। শুনেছেন এর মধ্যেই মার্কেট নির্মাণের জন্য পুকুরটি ভরাট করা হচ্ছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, তিনি এ বিষয়ে খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।