জয়পুরহাট সদরের বটতলী-পাকার মাথা সড়কের ধারকী চার রাস্তা মোড়। যানবাহনের ভিড় লেগেই থাকে। এ মোড়ে এলে দেখা যায় এক ব্যক্তি হাতে লাঠি ও মুখে বাঁশি নিয়ে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর পোশাক দেখেই বোঝা যায় তিনি সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত নন। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তিনি এ কাজ করছেন। তাঁর এ উদ্যোগ পুলিশ প্রশাসন, পথচারী, যানবাহনের চালকসহ সর্বসাধারণের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

লুৎফর রহমান (৬৬) ধারকী উত্তরপাড়ার বাসিন্দা। পেশায় রিকশাচালক। অথচ এ দরিদ্র মানুষটিই সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ থেকে দু'বছর ধরে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। যানবাহন চালকরা জানিয়েছেন, এ চৌরাস্তার মোড়ে আগে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটত। লুৎফরের এ উদ্যোগের ফলে তাঁরা দূর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন।

গত সোমবার সকালে সড়কটি হয়ে ধানবোঝাই ট্রাক নিয়ে শহরের দিকে যাচ্ছিলেন চালক শাহাদত হাসান। তিনি বলেন, শুধু জয়পুরহাটই নয়, পার্শ্ববর্তী নওগাঁ, বগুড়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের পূর্বাঞ্চলগামী যাত্রীবাহী বাস, মালবোঝাই ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে এ পথে। এ ছাড়া সড়কটির দুই পাশে পাকার মাথা থেকে বটতলী পর্যন্ত প্রায় শতাধিক গ্রামের হাজার হাজার মানুষ ও ছোট-বড় অনেক যানবাহনও চলাচল করে। জেলা শহর থেকে এর দূরত্বও খুব বেশি নয়। এর পরও এই মোড়ে সরকারিভাবে কোনো ট্রাফিকের ব্যবস্থা নেই। আগে প্রায়ই দূর্ঘটনা ঘটত এই মোড়ে। বেশ কিছু দিন থেকে হতদরিদ্র লুৎফর নিজ উদ্যাগে যানবাহন পারাপার করে দিচ্ছেন। এরপর থেকে এই মোড়ে আর বড় ধরনের কোনো দূর্ঘটনা ঘটতে দেখা যায়নি।

ধারকী গ্রামের মোজাম্মেল হক বলেন, দরিদ্র লুৎফর প্রায় দুই বছর ধরে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তিনি এই মোড়ে থাকায় আর দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা যায়নি। তিনি তো সরকারিভাবে এ দায়িত্ব পালন করছেন না। এ কাজের জন্য তাঁর বেতন-ভাতাও নেই। তাঁর জীবন কীভাবে চলে তা তো কেউ ভাবছে না, শুধু সেবাটাই নিয়ে যাচ্ছে।

'প্রাইভেট ট্রাফিক' নামে পরিচিত লুৎফর রহমান বলেন, রিকশাচালক হওয়ায় তিনি অনেক দুর্ঘটনা ঘটতে দেখেছেন। ২০১৮ সালে একদিন একটি যাত্রীবাহী বাস সেতু থেকে নেমেই খাদে পড়ে উল্টে গিয়ে ১০ জন মারা গিয়েছিল। সেদিন তিনি ওই দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। সে দিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, এভাবে আর কোনো প্রাণ হারাতে দেবেন না। তাই তিনি এই মোড়ে ২০২০ সালের শুরুর দিকে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব পালন করছেন। যতদিন শরীরে কুলাবে ততদিনই এ কাজ করবেন।

লুৎফর জানান, তিন মেয়ে, স্ত্রীসহ তাঁর পরিবার। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বয়সের ভারে আর রিকশাও চালাতে পারেন না। এ কাজ করেন বলে অনেক চালক স্বেচ্ছায় তাঁকে দু-এক টাকা করে দেন। সে টাকাতেই তাঁর জীবন চলে। তবে ছোট মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। এ নিয়েই এখন তিনি চিন্তিত।

স্থানীয় বম্বু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোল্লা শামসুল আলম বলেন, লুৎফর নিজ উদ্যোগেই এতদিন ধরে এই মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ বিনিময়ে তিনি কিছুই পান না। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি এ কাজ করেই যাচ্ছেন। সবাই মিলে আর্থিকভাবে সহায়তা করলে তাঁর উপকার হবে।
পুলিশ সুপার নুরে আলম বলেন, সততা, নিষ্ঠা আর পরিশ্রমই যে একজন মানুষকে সম্মানীত করে, তার উদাহরণ লুৎফর রহমান। তাঁর কাজে তিনি গর্বিত। তাঁকে আর্থিকভাবে সহযোগিতারও আশ্বাস দেন তিনি।