ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

বাড়ছে সাতকরা, শুঁটকি ও জারা লেবু রপ্তানি

বাড়ছে সাতকরা, শুঁটকি ও জারা লেবু রপ্তানি

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ফতেহপুরে বাগেরখলা এলাকায় নিজের জারা লেবুর বাগানে কৃষক কামরুল ইসলাম। ছবি-সমকাল

 মুকিত রহমানী, সিলেট

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০০:৩০ | আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০৭:২৩

সাতকরা, শুঁটকি, জারা লেবু কিংবা নাগা মরিচ পছন্দ করেন না এমন মানুষ সিলেট অঞ্চলে কম। এর মধ্যে শুঁটকি ও নাগা মরিচ দেশের অন্য অঞ্চলে পাওয়া গেলেও সাতকরা কেবল সিলেট অঞ্চলেই হয়। এসব পণ্যের ব্যাপক কদর প্রবাসেও। তাই বছরের পর বছর রপ্তানি হচ্ছে সাতকরা, শুঁটকি ও জারা লেবু। কয়েক বছর ধরে নাগা মরিচ ও গোয়ালগাদ্দা শিম যাচ্ছে বিদেশে। তালিকায় আরও রয়েছে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডেফল ও তৈকর।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিবছর এসব পণ্য রপ্তানি হয় ৬০০ থেকে ৭০০ টন। তবে সিলেটে এসব পণ্যের বাণিজ্যিক উৎপাদন বাড়লেও প্যাকেজিং হাউস না থাকায় ছন্দপতন ঘটছে রপ্তানিতে। কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহের পর ঢাকায় প্যাকেজিং হয়ে সেই পণ্য যাচ্ছে বিদেশে। এতে সময় লাগছে বেশি। পাশাপাশি পণ্যের সতেজ ভাব নষ্ট হচ্ছে। রপ্তানিকারকরা তাই সিলেটে দ্রুত প্যাকেজিং হাউস চালুর দাবি জানান। তারা বলেন, ওসমানী বিমানবন্দরে কার্গো ভিলেজ নির্মাণ শেষ হয়েছে। এতে প্যাকেজিং হাউস করা সহজ হয়েছে। 

রপ্তানিকারকরা জানান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার, দুবাই, ওমানসহ কয়েকটি দেশে সিলেটে উৎপাদিত সাতকরা, শুঁটকি, জারা লেবু ও নাগা মরিচের বিশাল বাজার রয়েছে। তাই সিলেট অঞ্চলের অনেক কৃষক ধান-গম চাষ বাদ দিয়ে সবজি জাতীয় এসব পণ্য উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। সিলেটের কৃষি বিভাগ তাদের নানাভাবে সহায়তা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবল অ্যান্ড এলাইড প্রডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা মঞ্জুর আহমদ জানান, সিলেট থেকে এসব পণ্য রপ্তানি বাড়ছে। গত বছর রপ্তানি হয় সবচেয়ে বেশি ৭০০ টন, যা ২০২২ সালে ছিল ৫৫০ টন এবং ২০২১ সালে ৪০০ টন।

জৈন্তাপুরের ফতেহপুর দক্ষিণ বাগেরখালের জারা লেবু চাষি কামরুল ইসলাম বলেন, ‘কষ্ট করে লেবু ফলাই, কিন্তু সঠিক দাম পাই না। আমাদের কাছে এক-দেড়শ টাকায় কেনা লেবু বিদেশে ২ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।’ সরাসরি রপ্তানির ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি। 

সিলেট অঞ্চলের কয়েক হাজার পরিবার তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে জারা লেবু, গোয়ালগাদ্দা শিম, নাগা মরিচ, সাতকরা ও শুঁটকি উৎপাদন শুরু করেছে। অনেকে জমি বর্গা নিয়ে এসব চাষ করছেন। কৃষক কামরুল ইসলাম চার বছর আগে এক একর জমি বর্গা নেন বছরে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার শর্তে। সেই জমিতে লেবু চাষে এ পর্যন্ত তাঁর ব্যয় হয় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আর আয় করেছেন ১০ লাখ টাকা। কৃষকদের সহায়তা, উৎপাদন ও বিপণনে সরকারকে আরও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন মঞ্জুর আহমদ। তিনি বলেন, ‘সারাদেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য দেশের বাইরে যায়। তবে সিলেটের কিছু পণ্য প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়।’

ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি কেজি সাতকরা ৩-৪ পাউন্ড, নাগা মরিচ প্রতি পিস ৭ পেনি, জারা লেবু প্রতি কেজি ৫ পাউন্ড, গোয়ালগাদ্দা শিম ৪ পাউন্ড, বিভিন্ন জাতের শুঁটকি (সিদল, গজার, শোল, টাকি) প্রতি কেজি ৫ থেকে ২০ পাউন্ড দরে রপ্তানি হয়। এর মধ্যে শুধু গোয়ালগাদ্দা শিম বছরে তিন মাস এবং বাকিগুলো প্রায় সারাবছর রপ্তানি হয়। সিলেট থেকে প্রতিদিন লেবু ১ হাজার পিস, নাগা মরিচ ১০ হাজার পিস, শিম ৫ হাজার কেজি ও শুঁটকি ৫ হাজার কেজি রপ্তানি হচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। 
 
সাতকরা

লেবুজাতীয় এ ফল বৃহত্তর সিলেট, ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকায় হয়। সাতকরা দিয়ে মাছ, মাংস ছাড়াও বিভিন্ন তরকারি রান্না হয়। এর আচারও অনেক সুস্বাদু। সিলেটের সাতকরার আচারের চাহিদা তাই দেশ-বিদেশে। মৌলভীবাজারের বড়লেখায় সাতকরাকান্দি নামে একটি গ্রাম রয়েছে। তবে সাতকরার বড় উৎপাদন কেন্দ্র হলো সিলেটের জৈন্তাপুর, সেখানে সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। 

জারা লেবু

জারা লেবুর প্রধান উৎপাদন এলাকা জৈন্তাপুর। উপজেলার গৌরী, থুবাং, বালিদাঁড়া, ভিত্রিখেল উত্তর, লামাপাড়া থুবাং, শ্যামপুর, হরিপুর, বাগেরখাল, শিকারখাঁ, উৎলারপার, উমনপুর, পানিছড়া, ঠাকুরের মাটিসহ বিভিন্ন গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে জারা লেবুর চাষ হচ্ছে। গত মৌসুমে এখান প্রায় সোয়া কোটি টাকার জারা লেবু বিক্রি হয়। তবে এবার বিক্রি দেড় কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন জৈন্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামিমা আক্তার। তিনি জানান, এখানে প্রায় ১২০ হেক্টর জমিতে জারা চাষ হয়েছে। 

শুঁটকি

শুঁটকির বড় উৎপাদন এলাকা হলো সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের বিশ্বনাথ উপজেলার মাহতাবপুর। শুঁটকির প্রায় ৪০টি ডাঙি রয়েছে সেখানে। পুঁটি, ট্যাংরা, বাইম, চিংড়ি, চাঁন্দাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শুঁটকি শুকানো হয়। মাহতাবপুর ছাড়াও আজমিরীগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় শুঁটকি হয়।

গোয়ালগাদ্দা শিম

‘গোয়ালগাদ্দা’ শিম উৎপাদন হয় গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ এলাকায়। সুস্বাদু এই শিম দেশে-বিদেশে সমান জনপ্রিয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাশরেফুল আলম জানান, চলতি বছর এখানে ৫৫৫ হেক্টর জমিতে গোয়ালগাদ্দা শিম চাষ হয়েছে। আগামী বছর তা বাড়িয়ে ৬০০ হেক্টর করার পরিকল্পনা রয়েছে। 

নাগা মরিচ

জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট ও সদর উপজেলার কিছু অংশে নাগা মরিচ চাষ হচ্ছে। এই মরিচের ঘ্রাণ একটু আলাদা, তাই কদর বেশি। চলতি অর্থবছর এখানে নাগা মরিচ চাষ হয়েছে ১৪১ দশমিক ৫ হেক্টর জমিতে। হরিপুরের বেলাল আহমদ জানান, তিন বিঘা জমিতে আড়াই লাখ টাকা খরচ করে নাগা মরিচ চাষ করে ৭-৮ লাখ টাকা লাভ করেছেন তিনি। 

রপ্তানিকারক ও সংশ্লিষ্টরা যা বলেন

জালালাবাদ ভেজিটেবল অ্যান্ড ফ্রোজেন ফিশ এক্সপোর্টার গ্রুপের সভাপতি মো. মুস্তাফিজুর রহমান সমকালকে জানিয়েছেন, ১০ বছর আগে সিলেট থেকে দু-একটি পণ্য রপ্তানি হতো। এখন সাগ–আটটি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। দিন দিন বাজার সম্প্রসারণ হলেও এলাকায় প্যাকেজিং হাউস না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। এজন্য ওই সব পণ্য সিলেট থেকে ঢাকায় নিতে হচ্ছে। এতে অনেক সময় চলে যায়, পণ্য নষ্টও হয়। তিনি বলেন, ‘সিলেটে কার্গো টার্মিনাল হয়েছে। এখন পথ অনেক সোজা। অনায়াসে সেখানে প্যাকেজিং হাউস করা যায়।’

বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক হাফিজ আহমদ বলেন, ‘১০০ টন ধারণক্ষমতার কার্গো টার্মিনালের কাজ শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে একটি স্ক্যানার মেশিনও স্থাপন হয়েছে। এখন পণ্য রপ্তানির জন্য আলাদা প্যাকেজিং হাউস দরকার।’

সিলেট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ খয়ের উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘এ অঞ্চলের যেসব পণ্য রপ্তানি হচ্ছে, সেগুলো উৎপাদনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন কৃষকরা। এ ব্যাপারে কৃষি বিভাগ থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে।’ 

আরও পড়ুন

×