দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সবজির হাট যশোরের বারীনগর। সবজি এলাকাখ্যাত যশোরের চুড়ামনকাটি, বারোবাজার, চৌগাছা ও পার্শ্ববর্তী জেলার কোটচাঁদপুর অঞ্চলের কৃষকদের সবজি হাট থেকে কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে বিক্রি করেন ব্যাপারীরা। তবে এ হাটে অসাধু সিন্ডিকেটের ফড়িয়াদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ কৃষক। ৪০ কেজিতে এক মণ হলেও কয়েক বছর ধরে ৪৬ থেকে ৪৮ কেজিতে মণ হিসেবে কিনছেন ফড়িয়ারা। এ কারণে প্রতি মণে ছয় থেকে আট কেজি সবজি বেশি দিতে হচ্ছে কৃষকদের। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করেও মিলছে না প্রতিকার। এতে দিনের পর দিন ঠকছেন তাঁরা।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে হাটে কথা হয় সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি এলাকার আবদুল হাকিমের সঙ্গে। নছিমন দিয়ে ১০ মণ মুলা ও ৫ মণ বেগুন নিয়ে এসেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যত লস সব চাষির। একদিকে দাম কম। অন্যদিকে পাইকার ও হাট ইজারাদারদের চাপ রয়েছে। তাঁদের সবজি প্রতি মণে বাড়তি ৫ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত ফাও (বিনামূল্যে) দিতে হয়। কৃষকের সবজি ৪৫-৪৮ কেজিতে মণ হয়। এটা দেখার কেউ নেই। তিনি অভিযোগ করেন, সবজি মেপে টাকা দেওয়ার সময় আরও কয়েক কেজি সবজির দাম কম দেন ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা।

আব্দুল হাকিমের কথার সূত্র ধরে আরও ৮-১০ জনের সঙ্গে কথা বলে একই তথ্য জানা গেছে। শওকত হোসেন নামে এক সবজি চাষি বলেন, সবজি আমাদের কষ্টের ফসল, উৎপাদন করতে অনেক কষ্ট করি, যদি সঠিক মাপে বিক্রি করতে পারি, তাহলে উপকৃত হতাম। আমরা মণে ৪০ কেজি সবজি দিতে চাই।
পাইকার শাহরিয়ার আহমেদ সানী দাবি করেন, ওজন করার পর বিভিন্ন সবজির পাতা, ডাল ও অন্যান্য অংশ বাদ যায়। এজন্য মণপ্রতি ধলতা (বিনামূল্যে) নেওয়া হয়। এটা না নিলে তো পরে ওজনের হিসাব মেলানো যাবে না।

যশোরের বাজারে উঠতে শুরু করেছে আগাম শীতকালীন সবজি। গত বছরের তুলনায় এবার সবজির দাম বেশি। কিন্তু সেই দামেও উৎপাদন খরচ পোষাচ্ছে না। এতে অধিকাংশ চাষি লাভের মুখ দেখতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। চাষি থেকে ভোক্তার খাবার টেবিল পর্যন্ত সবজি পৌঁছাতে কয়েক দফা হাত বদল হচ্ছে। এতে দাম বেড়ে যাচ্ছে কয়েক গুণ। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হলেও ঠকছেন চাষি ও ভোক্তা।

অন্যতম বৃহত্তম সবজির মোকাম যশোরের বারীনগর সাধারণ কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, আগাম শীতকালীন সবজিতে ভরপুর বাজার। ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে মুখরিত। ভোর থেকে কৃষকরা সবজি নিয়ে হাজির হন মোকামে। চলছে বেচাকেনা। প্রতি কেজি বেগুন ৪৫-৫০, ফুলকপি ৫৫-৬০, শিম ৬০-৬৫, পাতাকপি ২০, মুলা ১৫-২০ টাকা, মরিচ ২৫-৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একই সবজি কয়েক হাত ঘুরে যশোর শহরে প্রতি কেজি ১৫-২০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভোক্তা চড়া দামে কিনছেন এসব সবজি।

চাষি রজব আলী বলেন, কৃষকের বাঁচার উপায় নেই। আবাদের খরচ বেড়েই চলেছে। তেল, সার, কীটনাশক কেনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি। অনেক কষ্টে আবাদ করেছি। বাজারে এসে যে দাম পাচ্ছি, তাতে কোনো রকমে খরচ উঠবে। লাভের মুখ দেখতে পারব না।

সদর উপজেলার বালিয়াঘাট এলাকার চাষি হরেন ঘোষ বলেন, সবাই চাষি মারার কল পেতে রেখেছে। লোকসান সব চাষির ঘাড়ে। তেল, সার, কীটনাশকের দাম লাগামছাড়া। এভাবে কত দিন টিকব জানি না। অনেক কষ্টে উৎপাদিত সবজি বিক্রি করতে এসে দাম পাচ্ছি না।

সবজি সরবরাহকারী তৌহিদ ফিট্টু বলেন, বেশি দামে কিনে খুচরা ব্যবসায়ী পর্যন্ত পৌঁছাতে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে লেবার খরচও বেড়েছে। সব খরচ যোগ করে সবজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এতে বাড়তি চাপ পড়ছে ভোক্তার ওপর।

ইজারাদার আবদুস সোবহান বলেন, প্রতি সপ্তাহে এ হাট থেকে প্রায় দেড় হাজার টন সবজি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়। এ বছর তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয় হয়েছে দ্বিগুণ। ফলে কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে দামের হেরফের হচ্ছে।

যশোরের ভোক্তা অধিকারের উপপরিচালক ওয়ালিদ বিন হাবিন বলেন, কৃষক অভিযোগ করলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয় : শীতকালীন সবজি ওজনে কারসাজি সবজির হাট

মন্তব্য করুন