সিলেট নগরের আম্বরখানা বড় বাজার এলাকায় বিএনপি নেতা আ ফ ম কামাল হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। হত্যার জন্য পরস্পরকে দায়ী করা হচ্ছে। বিএনপি বেশি বাড়াবাড়ি করলে ১৯ নভেম্বরের সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না বলেও আওয়ামী লীগ হুমকি দিয়েছে। খুনের পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করে তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আর্থিক লেনদেনের কারণে বিরোধ সৃষ্টির বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

আ ফ ম কামাল লাহিন এয়ার ইন্টারন্যাশনাল নামের রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে লোক বিদেশ পাঠানো নিয়ে সম্প্রতি বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। লামাকাজী এলাকার আজিজুর রহমান সম্রাট নামের এক ব্যক্তির ৩ লাখ টাকা পাওনা নিয়ে বিরোধের জেরে সম্প্রতি কামালের সঙ্গে মারামারি হয়। এতে সম্রাটের পক্ষে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী অবস্থান নেন। মারধরের ঘটনায় গত ২১ অক্টোবর সম্রাট বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। সেই মামলার ৪ নম্বর আসামি ছিলেন কামাল। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে কামালের দ্বন্দ্বের বিষয়েও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা।

রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে আম্বরখানা বড় বাজার এলাকায় নিজ প্রাইভেটকারে জেলা বিএনপির সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিকল্পনাবিষয়ক সম্পাদক ও সিলেট ল কলেজের সাবেক জিএস আ ফ ম কামালকে দুর্বৃত্তরা ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা প্রথমে সেখানে কী ঘটছে বুঝতে পারেননি। তাঁদের ধারণা ছিল, একটি মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়েছে প্রাইভেটকার। তাঁরা প্রথমে মোটরসাইকেলটি কারের সামন থেকে সরান। কিন্তু কারের ভেতর বসা কামালকে যে কোপানো হয়েছে, তা প্রত্যক্ষদর্শীরা আঁচ করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মাহবুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। তিনি জানান, দু'জন কামালকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যান। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে গেল কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। কামালকে কোপানোর আগে মোটরসাইকেলে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে অনুসরণ করে। দুর্ঘটনার পরিবেশ সৃষ্টি করে গাড়িতেই উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে খুন করা হয়। পুলিশ দুর্ঘটনাকবলিত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছে। সেই মোটরসাইকেলের সূত্র ধরেও তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করেছে পুলিশ। এ বিষয়ে মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ জানিয়েছেন, আর্থিক লেনদেনসহ বিভিন্ন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। খুব শিগগির হত্যার ক্লু উদ্ঘাটন হবে। নগরীর সুবিদবাজার এলাকার বাসিন্দা আ ফ ম কামালের গ্রামের বাড়ি সদর উপজেলার আলীনগর গ্রামে।

রোববার রাতে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন নেতাকর্মীরা। মধ্য রাতে রিকাবিবাজারের কবি নজরুল অডিটোরিয়ামের সামনে লাগানো আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভার ব্যানার ও পোস্টার তারা ছিঁড়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুরও করে। এর প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক মিছিল করে ছাত্রলীগ। মিছিল থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের ধাওয়া করা হয়।

এদিকে গতকাল ওসমানী হাসপাতালের মর্গে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরের বুকে, হাতে ও পায়ে ২৫টি আঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এয়ারপোর্ট থানার ওসি খান মোহাম্মদ মাইনুল জাকির। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ বিকেলে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। তাঁকে নিজ গ্রাম আলীনগরে দাফন করা হয়েছে। বিকেলে নগরীতে জানাজার উদ্যোগ নিলেও ময়নাতদন্তে বিলম্বসহ বিভিন্ন কারণে তা বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা। ময়নাতদন্তকারী সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. শামসুল ইসলাম সমকালকে জানিয়েছেন, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই মারা গেছেন কামাল। লাশ গ্রহণকালে কামালের বড় ভাই মইনুল হক সমকালকে বলেন, তাঁর ভাইকে আওয়ামী লীগের লোকজনই খুন করেছে। তিনি হত্যার বিচার দাবি করেন।

আ ফ ম কামাল হত্যাকাণ্ড নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা। যে কোনো সময় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, কামালকে ছাত্রলীগের কর্মীরাই খুন করেছে। খুনিদের গ্রেপ্তার না করলে আন্দোলন শুরুর কথা জানান তিনি। নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন বলেন, বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধে কামাল খুন হন। খুনের সঙ্গে তাঁদের কোনো নেতাকর্মী জড়িত নন। হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপির নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভার পোস্টার, ব্যানার ও তোরণ খুলে ফেলে। জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছিঁড়ে ফেলে। এ বিষয়ে বৈঠক করে করণীয় নির্ধারণ করা হবে। বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাদের বিভাগীয় সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না।

গত শুক্রবার কামাল তাঁর ফেসবুক আইডিতে সর্বশেষ একটি পোস্ট করেন। এতে সিলেট বিএনপির সমাবেশকে সামনে রেখে তিনি উল্লেখ করেন, 'যেসব ভাই অতীতে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে মামলা-মোকদ্দমার শিকার হয়েছেন, বর্তমানে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না থাকলেও সতর্ক থাকবেন। যাঁদের পদপদবি আছে, তাঁরাও সতর্ক থাকবেন। সিলেটের বাইরের নেতাকর্মীদের আমরা ১০০ ভাগ গ্যারান্টি দিয়ে আশ্বস্ত করতে চাই, আপনারা নির্দি্বধায় চলে আসতে পারেন, কোনো সমস্যা হবে না। সমস্যা হলে যোগাযোগ করবেন, সঙ্গে সঙ্গে আমরা আপনাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াব ইনশাআল্লাহ।'

তিন দিনের শোক কর্মসূচি :বিএনপি নেতা কামালের হত্যাকাণ্ডে তিন দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার কালো ব্যাজ ধারণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হবে। গতকাল জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল কাইয়ুম জালালী পংকি, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী ও মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব মিফতাহ সিদ্দিকী এক বিবৃতিতে হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা জেলা বিএনপির সাবেক স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক আ ফ ম কামালকে হত্যা করেছে। অবিলম্বে জড়িত সন্ত্রাসীদের ও নেপথ্য গডফাদারদের গ্রেপ্তারের দাবি করেন তাঁরা।


বিষয় : সিলেটে কামাল হত্যাকাণ্ড বিএনপি-আ'লীগ মুখোমুখি

মন্তব্য করুন