'ইখানো কয়েক দিন আগে আছিল আওয়ামী লীগের ব্যানার ফেস্টুন, কোনটা ছিইরা আর কোনটার উপরে লাগাইছে এরা (বিএনপি), ইটা লইয়া তেমন কোনো কথাবার্তা নাই, অন্যবার তো আওয়ামী লীগের ব্যানার হরাইলে রক্তারক্তি অইতো, ই-ফিরা কোনো নড়াচড়া নাই। বিনা বাধায় মাইকে জিয়া-তারেকের ভাষণ প্রচার অর (হচ্ছে)। তলে তলে যে বোঝাপড়া অইছে, প্রচার দেখলেই বোঝা যার।'
সিলেটে বিএনপির গণসমাবেশস্থল সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের পাশের এক চা দোকানির ভাষ্য এমনই। মাঠের পাশে একটিই সড়ক। নগরীর কেন্দ্রস্থলের চৌহাট্টা ও রিকাবীবাজার পয়েন্টের সঙ্গে যুক্ত সড়কটি ব্যবহূত হচ্ছে প্রচারণার কাজে। দুই পয়েন্ট ঘিরে গণসমাবেশের নজরকাড়া প্রচারণা। বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুনে সয়লাব পুরো এলাকা।

এর মধ্যে বিশেষায়িত শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের সম্মুখভাগ পুরোটা ঢাকা পড়েছে প্রচারণার ব্যানার-ফেস্টুনে।


একই জায়গায় সপ্তাহখানেক আগে ছিল আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভা। সম্প্রতি সিলেট নগরীর আম্বরখানায় ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে খুন হন বিএনপি নেতা আ ফ ম কামাল। এ ঘটনার পর আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের পাশের সড়কে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি ভাঙচুরের ঘটনায় ২৫০ বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হলেও ওই দিন চারজন গ্রেপ্তার ছাড়া আর কাউকে আটক করা হয়নি। আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের পাশের সড়কে আওয়ামী লীগের নেতাদের নামে যেসব বিলবোর্ড ছিল, সেখানে বিএনপির সমাবেশ উপলক্ষে সাঁটানো হয়েছে বিএনপি নেতাদের বিলবোর্ড। স্থানীয়ভাবে প্রচার আছে, আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনীতিতে সহাবস্থান থাকায় এমনটা সম্ভব হয়েছে। ভেতরে ভেতরে বোঝাপড়ায় বড় কোনো অঘটনের ঘটনাও ঘটেনি। অনেকে বলছেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের একটি অংশের সখ্য থাকায় গণসমাবেশের ব্যাপক প্রচারণা হয়েছে।

এদিকে, সমঝোতা করে এই ক'দিন সমাবেশের প্রচারণাসহ প্রস্তুতি চললেও শেষ সময়ে পরিবহন ধর্মঘটসহ নানা কারণে রয়েছে উৎকণ্ঠাও। সমঝোতার পথে কাঁটা হয়ে বিঁধছে উপজেলা সদরগুলোর উত্তপ্ত অবস্থা। বিয়ানীবাজারে গত মঙ্গলবার বিএনপির প্রচারণায় ছাত্রলীগ বাধা দেয় বলে অভিযোগ। একই দিন ওসমানীনগরে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও নিখোঁজ নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর প্রচারণায় হামলারও অভিযোগ উঠেছে। এ দুই ঘটনার পর সমঝোতায় কাঁটা হয়ে বিঁধেছে পরিবহন ধর্মঘট। আজ শুক্রবার ভোর থেকে পরিবহন ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন। এতে করে উভয় দলের সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থান কতটা মসৃণ থাকে, এই নিয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যেও রয়েছে সংশয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরীর চৌহাট্টা ও রিকাবীবাজার ঘুরে দেখা গেছে, কোনো জায়গা আর ফাঁকা নেই। বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড থেকে শুরু করে আশপাশের সড়ক ও এলাকা ছেয়ে গেছে ব্যানার-ফেস্টুনে। নগরীর মূল কেন্দ্রস্থলের চৌহাট্টা পয়েন্টে আটটি বিজ্ঞাপন বোর্ডের অধিকাংশ সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর ব্যানার। এর মধ্যে ছয়টি ছিল আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভা উপলক্ষে ব্যানার-ফেস্টুনে ঢাকা। সেগুলোর ওপর সাঁটানো হয়েছে বিএনপির গণসমাবেশের ব্যানার। এ ছাড়া সড়কের দুই পাশে এবং সড়ক বিভাজকে লাগানো সৌন্দর্য বর্ধনের গাছে পেরেক মেরে ঝোলানো হয়েছে বিভিন্ন নেতাকর্মীর ফেস্টুন।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, বিজ্ঞাপনী সংস্থার বিলবোর্ডে এক সপ্তাহ আগেও আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রচারণার নানা রকম ব্যানার-ফেস্টুন দেখা গেছে। এগুলো অপসারণ করে সাঁটানো হয়েছে বিএনির প্রচারণার ব্যানার-ফেস্টুন। রিকাবীবাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেছেন, সর্বশেষ ২০১২ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সমাবেশ উপলক্ষে এমন প্রচারণা দেখেছিলেন তাঁরা। এর পর প্রায় ১০ বছর বিরতি দিয়ে এমনটি দেখছেন।
আগের দিন ও গণসমাবেশের দিন সিলেটে পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করায় বড় সংকটে পড়েছেন বিএনপি নেতারা। ধর্মঘট না ডাকার জন্য নানাভাবে পরিবহন মালিক-শ্রমিকসহ সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন সমকালকে বলেন, পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা ধর্মঘটের পক্ষে ছিলেন না; কিন্তু সরকারের চাপে তাঁরা ঠিক থাকতে পারেননি। বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশগুলোকে সামনে রেখে দেশের অন্যান্য স্থানেও একইভাবে পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছিল। তবে এভাবে গণসমাবেশে মানুষের অংশগ্রহণ ঠেকানো যাবে না।

সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, এখানে সমঝোতার কোনো বিষয় নয়। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সবার সহায়তা চাওয়া হয়েছে। সিলেট নগরে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। বিভিন্ন উপজেলায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের আশপাশে কারও ব্যানার-ফেস্টুন ছিল না জানিয়ে তিনি বলেন, শূন্য স্থানে বিএনপির সমাবেশের ব্যানার, ফেস্টুন ও তোরণ করেছেন নেতাকর্মীরা।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল বলেন, বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার কোনো বিষয় আমাদের নেই। সিলেটের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেশের অন্যান্য স্থানের থেকে অভিন্ন। কিন্তু বিএনপি প্রতিহিংসার পথ বেছে নিচ্ছে। তাদের এক নেতা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে খুন হয়েছেন। এই ঘটনায় তারা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভার সময় লাগানো ব্যানার-ফেস্টুন, বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি ভাঙচুর করেছে। এ বিষয়ে মীমাংসার প্রশ্নই ওঠে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চয়ই গ্রহণ করবে।

ধর্মঘট বিষয়ে তিনি বলেন, পরিবহনে বিভিন্ন দল-মতের মানুষ আছেন। ধর্মঘটে সাধারণ মানুষও বিড়ম্বনায় পড়ে। কিন্তু অতীতের জ্বালাও-পোড়াওর তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে নিশ্চয়ই পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা ধর্মঘটে গেছেন।
মেয়র আরিফুল হকের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগের বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই মন্তব্য করে এ আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, সিলেটে সরকারের নানা উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। প্রধানমন্ত্রী যখন সিলেটে এসেছিলেন, তখনও মেয়র আরিফকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশনের মেয়র থাকায় তাঁর সঙ্গে এই যোগাযোগ। তবে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ফোন না ধরায় এই প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।