ফুটবলপ্রেমীরা শুরু করেছেন দিনক্ষণ গণনা। গোটাবিশ্বের সঙ্গে এক মাসের এ রোমাঞ্চের জন্য অধির আগ্রহে বাংলাদেশি সমর্থকরাও। পিছিয়ে নেই ফরিদপুরের বাসিন্দারাও। কাতারের ফুটবল বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামের আদলে ফরিদপুরেও তৈরি করা হয়েছে ৮টি স্টেডিয়াম। স্টেডিয়ামগুলো দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন মানুষেরা।

বিশ্বকাপের উত্তাপ বাড়াতে ফরিদপুর পৌর এলাকার ভাজনডাঙ্গায় টিবি হাসপাতালের পাশে একটি মাঠে তৈরি করা হয়েছে ৮টি স্টেডিয়াম। কাতারে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপের খেলাগুলো যে ৮টি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে, সেই আদলেই তৈরি করা হয়েছে স্টেডিয়ামগুলো। এই উদ্যোগ নিয়েছেন কাতার প্রবাসী মাসুদুর রহমান। 

মাসুদুর রহমান দীর্ঘ ১০ বছর কাতারে রয়েছেন। কাতারে থাকার কারণে তিনি বিশ্বকাপের খেলাগুলো যে সকল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে, সেই স্টেডিয়ামগুলোতে তিনি গিয়েছেন এবং খেলা দেখেছেন। সেই থেকেই তার চিন্তা তিনি তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে একইরকম স্টেডিয়াম তৈরি করবেন।

দেড় মাস আগে মাসুদুর রহমান দেশে আসেন এবং নিজস্ব অর্থায়নে স্থানীয় তরুণদের সঙ্গে নিয়ে স্টেডিয়ামের কাজ শুরু করেন। একইসঙ্গে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৩২ দলের পতাকা থাকবে মাঠে। খেলা চলাকালীন বড় পর্দায় দেখানো হবে সেসব খেলা। এছাড়া অন্য এলাকা থেকে যারা দেখতে আসবেন তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

কাতারে যে ৮টি স্টেডিয়ামে খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হবে সেগুলো হলো, আল থোমামা (টুপির মত আকৃতি), মদিনা খলিফা (পালতোলা নৌকা আকৃতি), নাইন সেভেন ফোর (সমুদ্রের পাড়ে), আল বাইয়াত (দূরে অবস্থিত), আল রাইয়ান (জাহাজের মত), লুসাইল (বাটির মত), আল জয়নু (শামুক) ও এডুকেশন সিটি। এর আদলেই ফরিদপুরে তৈরি করা হয়েছে স্টেডিয়ামগুলো। এগুলো তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে কাঠ, বাঁশ, পাঠখড়ি, পিভিসি সহ বিভিন্ন সামগ্রী।


মাসুদুর রহমান জানান, প্রথমে এই স্টেডিয়ামগুলোর নকশা জোগাড় করি। এরপর ভালোভাবে পর্যালোচনা করি। তারপর সিদ্ধান্ত নেই বাংলাদেশে আসবো। মনে হলো নিজে কাতারের মাঠে বিশ্বকাপ খেলা না দেখে এরকম কিছু করি যাতে দেশের মানুষ সেখানে বসে খেলা দেখবে আর ভাববে কাতারের মাঠে বসেই খেলা দেখছে। দেড় মাস আগে কাতার থেকে দেশে আসি। এরপর বাড়ির পাশে ভাজনডাঙ্গা এলাকায় টিবি হাসপাতালের সামনের মাঠে স্থানীয় তরুণদের সঙ্গে নিয়ে কাজ শুরু করি। 

তিনি আরও বলেন, আমি আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক। মেসি আমার প্রিয় খেলোয়ার। মেসির খেলা সবাই যেন এই ব্যতিক্রম মাঠে দেখতে পায় সেজন্য আমার এই আয়োজন।

মাসুদুর রহমান বলেন, ৮টি স্টেডিয়াম কাতারে যে ডিজাইনে তৈরি করা হয়েছে এখানেও সেই আদলে তৈরি করা হয়েছে। আল থোমামা স্টেডিয়াম কাতারে টুপির আকৃতিতে করা হয়েছে, এখানেও আমি চেষ্টা করেছি সেভাবে তৈরি করতে। নাইন সেভেন ফোর স্টেডিয়ামটি সমুদ্রের পাড়ে নির্মাণ করা হয়েছে, আমি এখানে একটি পুকুর পাড়ে নির্মাণ করেছি। কোনটি জাহাজের মত, কোনটি বাটির মত আবার শামুকের মতো করে তৈরি করা হয়েছে। এগুলো তৈরি করতে বাঁশ, কাঠ, পাঠখড়ি, পিভিসিসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, নিজের মনের তৃপ্তির জন্যই এই ব্যতিক্রম আয়োজন করেছি। এতে আমার প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। স্টেডিয়াম তৈরির পাশাপাশি আরো কিছু আয়োজন রয়েছে। প্রতিটি খেলা এখানে বড় পর্দায় দেখতে পাবে সবাই। দূর-দূরান্ত থেকে যারা আসবেন তাদের জন্য মাঠের পাশেই বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে বলা হয়েছে তাদের থাকতে দেওয়ার জন্য। কাতারে গিয়ে হোটেলে থাকতে হবে। আমার এখানে থাকার জন্য বাসা-বাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে। খাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এছাড়া মাঠের চার পাশে ৩২ দলের পতাকা উড়ানো থাকবে।

মাসুদুর রহমান জানান, কাতারে খেলা দেখতে গিয়ে মানুষ যে ধরনের সুবিধা পাবে ঠিক সেই আদলে এখানেও সব ধরনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া উদ্বোধনী দিনে মিলনমেলার আয়োজন করা হয়েছে। নিজে কাতারে খেলা না দেখে দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে সেই আবহ তৈরি করতেই আমার দেশে আসা।

স্টেডিয়াম তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন আলী আরশাদ। তিনি জানান, মাসুদুর রহমান সর্ম্পকে মামা হয়। মামা দেশে এসে এই ধরনের উদ্যোগের কথা বলার সাথে সাথে আমি ও আমার বন্ধুরা মামার সঙ্গে কাজ করি। ভাবতে ভালোই লাগছে এই ধরনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগের সঙ্গে থাকতে পেরে। পাশাপাশি অসহায় মানুষের জন্য মেডিকেল ক্যাম্পেরও আয়োজন করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা এস এম রুবেল বলেন, এই ধরনের ব্যাতিক্রম উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। কাতারে গিয়ে নয়, দেশের মাঠে বসেই কাতারে খেলা দেখার স্বপ্নপূরণ হবে। মাসুদুর রহমান নিজে কাতারে খেলা না দেখে আমাদের কথা চিন্তা করে দেশে এসে যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা অসাধারণ। তিনি একজন সাদা মনের মানুষ। এ ধরনের চিন্তা অনেকেই করেন না। তিনি রাত দিন পরিশ্রম করছেন, সাথে অর্থও খরচ করছেন। দেশের মধ্যে এই প্রথম এ ধরনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন মাসুদুর। সকলকে এই ব্যতিক্রমী স্টেডিয়াম দেখতে আসার আহ্বান জানান তিনি।