কোনোটি পড়ে আছে গাছের নিচে। গায়ে জমেছে ধুলোর আস্তর। কোনোটি পড়ে রয়েছে গ্যারেজে। ইঞ্জিন ঠিক রাখতে মাঝেমধ্যে দেওয়া হয় স্টার্ট। হাতে পাওয়ার পর এক দিনের জন্যও চালু হয়নি, এমনও আছে কোনো কোনোটি।

এই অবস্থা ভারত সরকারের উপহার হিসেবে দেওয়া অনেক অ্যাম্বুলেন্সের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে এ উপহার আসে। কিন্তু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সুবিধা সংবলিত বিশেষায়িত এসব অ্যাম্বুলেন্স দক্ষ জনবলের অভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পেয়েছে একটি অ্যাম্বুলেন্স। চলতি বছরের ২ জানুয়ারি এটি হস্তান্তর করে চট্টগ্রামে অবস্থিত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার কার্যালয়। এরপর থেকে গাড়িটি পড়ে আছে আন্দরকিল্লা পুরোনো নগর ভবনের সামনে। নগর ভবনের পাশে শ্রমিক ও কর্মচারী লীগের কার্যালয়। পাশেই একটি আমগাছ। সেই গাছের নিচে অ্যাম্বুলেন্সটি রাখা। অর্ধেক ত্রিপল দিয়ে ঢাকা, বাকিটা খোলা। গায়ে ধুলোর আস্তর। এখনও পর্যন্ত এ গাড়িতে একজন রোগীও বহন করা হয়নি।
এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল আলম বলেন, 'অ্যাম্বুলেন্সটি সেখানে কেন পড়ে থাকবে? রোগী পরিবহনের জন্য একটি রেট নির্ধারণ করা হয়েছে। যে কেউ চাইলে এটি ব্যবহার করতে পারবেন।' এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে জানালে তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ভালো জানবেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বলেন, অ্যাম্বুলেন্সটি পরিচালনা করতে চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও চালকের সমন্বয়ে একটি টিম করতে হবে। এ টিম করার জন্য প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে দফায় দফায় চিঠি দিলেও তিনি কর্ণপাত করছেন না। তার অবহেলার কারণে অ্যাম্বুলেন্সটি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সেলিম আকতার চৌধুরীর দুটি মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি সাড়া দেননি।

তবে সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্যবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহরলাল হাজারী বলেন, 'টিম গঠন ও নীতিমালা না হওয়ায় এটি এত দিন চালু করা যায়নি। তবে আমরা মাঝে মাঝে এটি চালু করি, যাতে কোনো যন্ত্রপাতি অচল না হয়। কয়েকজন টেকনিশিয়ানকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সটি চালু করা সম্ভব হবে।'

একই অবস্থা চুয়াডাঙ্গায়। সদর হাসপাতাল ও পৌরসভায় অযত্নে পড়ে আছে দুটি অ্যাম্বুলেন্স। একটি অ্যাম্বুলেন্স সদর হাসপাতাল কর্তৃৃপক্ষ গত বছরের ২৭ নভেম্বর বুঝে নেয়। সেটি এখনও চালু হয়নি। আর ২০২১ সালের ৭ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন ও পৌরসভার মেয়র জাহাঙ্গীর আলম মালিকের হাতে পৌরসভাকে দেওয়া অ্যাম্বুলেন্সের চাবি তুলে দেন ভারতের সহকারী হাইকমিশনার সঞ্জীব কুমার ভাটী। প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে একটিও চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার একটি নির্দিষ্ট গ্যারেজে রাখা আছে তাদের দেওয়া অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু সদর হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে সিভিল সার্জন অফিসের সামনে রাস্তায়।

মেয়র জাহাঙ্গীর আলম মালিক খোকন বলেন, দক্ষ জনবল ও রোগী পরিবহনে বেশি ব্যয় হওয়ায় এই অ্যাম্বুলেন্সে রোগী বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তা ছাড়া এতে যন্ত্রপাতির ঘাটতি আছে। একই মন্তব্য সদর হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক আতাউর রহমানেরও। তিনি বলেন, জনবলের অভাবে উদ্যোগও নেওয়া যাচ্ছে না।
বগুড়ায় বরাদ্দ হয়েছে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স। বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল এবং বগুড়া পৌরসভা গাড়ি তিনটি পায়। গত ২১ ডিসেম্বর উত্তরা মোটর্স অ্যাম্বুলেন্সগুলো বুঝিয়ে দেয়। একেকটির দাম ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা।

মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল ও পৌরসভার অ্যাম্বুলেন্স দুটি একদিনও চলেনি। তবে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের গাড়িটি প্রতিদিন সকালে গ্যারেজ থেকে বের করা হয় এবং বিকেলে গ্যারেজে রাখা হয়। পৌরসভার গাড়িটিও গ্যারেজে। ইঞ্জিন ঠিক রাখতে সপ্তাহে একদিন স্টার্ট দেওয়া হয়।

মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সচালক আব্দুল গোফ্‌ফার বলেন, 'এই অ্যাম্বুলেন্স সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সের মতো নয়, অনেক উঁচু। একটু জোরে চালালে কাত হয়ে যায়, সব রাস্তায় চালানো যায় না। এটি কীভাবে চালাতে হবে তা আমাদের জানা নেই।'

এই অ্যাম্বুলেন্স চালাতে চালক ছাড়াও তিনজন লোকের প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এটিএম নুরুজ্জামান। তিনজনের একজন চিকিৎসক, একজন অবেদনবিদ ও একজন নার্স।

প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে এই অ্যাম্বুলেন্স কোনো কাজে আসছে না জানিয়ে বগুড়া পৌরসভার মেয়র রেজাউল করিম বাদশা বলেন, তিনি এটি ব্যবহারের জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েছেন, কিন্তু সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো সাড়া পাননি।

একমাত্র চালু আছে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স। হাসপাতালের উপপরিচালক ওয়াদুদ হোসেন বলেন, এটি চালানোর জন্য যে টেকনিক্যাল জনবল প্রয়োজন তা নেই, তবু এটি আইসিইউ সুবিধা ছাড়াই সাধারণ অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে মাঝেমধ্যে চালানো হয়।