কুমিল্লার ঐতিহাসিক টাউন হল মাঠে আগামীকাল শনিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিএনপির মহাসমাবেশ। এ সমাবেশ ঘিরে কুমিল্লা হয়ে উঠেছে উৎসবের নগরী। বিএনপি নেতারা বলছেন, মহাসমাবেশে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটানো হবে। বিএনপির অন্য মহাসমাবেশের চেয়ে কুমিল্লা খানিকটা ব্যতিক্রম। আগের সমাবেশগুলোতে দু'দিন আগে থেকে সংশ্নিষ্ট এলাকায় 'পরিবহন ধর্মঘট' ডাকা হলেও কুমিল্লার বেলায় তা হয়নি। এ নিয়ে পরিবহন নেতারা বলছেন ভিন্ন ভিন্ন কথা।
বিএনপির দলীয় সূত্র বলছে, শনিবারের সমাবেশের আগে 'পরিবহন ধর্মঘট' দেওয়া হতে পারে- দলটির নেতাকর্মীর এমন শঙ্কা ছিল। সমাবেশ সফল করতে আশপাশের জেলার নেতাকর্মীকে আগেভাগেই কুমিল্লায় পৌঁছানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে বুধবার বিকেলে পরিবহন নেতারা ধর্মঘট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানোর পর বিএনপিতে স্বস্তি ফেরে।

এদিকে সমাবেশ মাঠে অবস্থান নিয়ে বহিস্কৃত নেতা সাবেক সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কু ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাজি আমিন উর রশিদ ইয়াছিন গ্রুপের মধ্যে সংঘাতের শঙ্কা করছেন তৃণমূলের কর্মীরা। যদিও দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এমন আশঙ্কা নাকচ করে দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলুসহ দলের বেশ কয়েকজন নেতা কুমিল্লায় অবস্থান করে সার্বিক বিষয় তদারক করছেন।

যে কারণে নেই পরিবহন ধর্মঘট :কুমিল্লায় ধর্মঘট থেকে কেন সরে গেলেন পরিবহন নেতারা- এ নিয়ে একাধিক নেতার সঙ্গে সমকালের কথা হয়। কুমিল্লা জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি অধ্যক্ষ কবির আহমেদ সমকালকে বলেন, 'দেশের অন্য বিভাগীয় শহরে যেখানে ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছিল, সেখানকার পরিবহন নেতারা তাঁদের কিছু দাবি আদায়ের কথা তুলে ধরে ধর্মঘট ডেকেছিলেন। আমাদের তো কোনো দাবি নেই; থাকলে অবশ্যই ধর্মঘট দেওয়া হতো।' তিনি আরও বলেন, 'ধর্মঘট দিতে সরকারের পক্ষ থেকে যদি চাপ থাকত কিংবা সমিতির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত থাকত, তাহলে আমাদের ওপরও তো চাপ থাকত। কই, এমন তো চাপ ছিল না।' তিনি বলেন, 'পরিবহন সমিতি একটি ব্যবসায়ী সংগঠন, এখানে বিএনপি সমাবেশ করতে চায় করুক, আমরা বেহুদা ধর্মঘট দেব কেন?'

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমিতির একাধিক নেতা বলেন, 'ধর্মঘট দিতে কেউ কেউ মতামত দিলেও তা সফল করা নিয়ে অনেক চ্যালেঞ্জিংয়ের বিষয়টি উঠে আসে। কুমিল্লার ওপর দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম, কুমিল্লা-সিলেট, কুমিল্লা-চাঁদপুর-নোয়াখালী, কুমিল্লা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট রেল সড়ক গেছে। যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। তাই এসব এলাকার পরিবহন-সংশ্নিষ্টরাও ধর্মঘট দিতে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি।'

সাক্কু-ইয়াছিন গ্রুপে সংঘাতের শঙ্কা :এই মহাসমাবেশ ঘিরে নগরীতে বিএনপিতে বিবদমান মনিরুল হক সাক্কু ও হাজি আমিন উর রশিদ ইয়াছিন গ্রুপের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙ্গা ভাব লক্ষ্য করা গেছে। সমাবেশ সফল করতে উভয় গ্রুপই প্রচারণা চালাচ্ছে। গত সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে দল থেকে বহিস্কৃত হয়েছেন সাক্কু। তিনি দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন। অন্যদিকে হাজি ইয়াছিন বর্তমানে দলের দক্ষিণ জেলার আহ্বায়ক। গত সিটি নির্বাচনে হাজি ইয়াছিনের শ্যালক ও মহানগর স্বেচ্ছাসবক দলের সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে অংশ নেন। তিনিও দল থেকে বহিস্কৃত।

দলীয় সূত্র বলছে, সাক্কু তাঁর এ পরাজয়ের জন্য ইয়াছিন গ্রুপকে দায়ী করেন। এ ছাড়া সম্প্রতি ঘোষিত দক্ষিণ জেলা ও মহানগর বিএনপিতে ইয়াছিন গ্রুপের প্রাধান্য দেওয়ায় উভয় গ্রুপে দলীয় টানাপোড়েন আরও তীব্র হয়েছে। তাই সমাবেশস্থল ও আশপাশের রাস্তায় উভয় গ্রুপের শোডাউন নিয়ে সংঘাতের শঙ্কা করছেন দলের অনেকেই। এ ব্যাপারে মনিরুল হক সাক্কু বলেন, 'দল থেকে আমাকে বহিস্কার করা হয়েছে। আমি দলে ফিরতে আবেদন করেছি। সমাবেশ সফল করতে দিন-রাত কাজ করছি, লোকজনকে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। তাই মঞ্চে ওঠা বড় কথা নয়, আমি কর্মীদের নিয়ে সমাবেশস্থলে অবস্থান করব; কারও হুমকিতে মাঠে যাওয়া থেকে বিরত থাকব না।' হাজি আমিন উর রশিদ ইয়াছিন বলেন, 'কুমিল্লার সমাবেশ হবে লাখো জনতার সমাবেশ। এখানে কে কার গ্রুপের, তা চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। এককথায়, আমরা সবাই খালেদা জিয়া-তারেক রহমানের লোক। এখন সমাবেশ সফল করাই টার্গেট; গ্রুপিং নিয়ে কথা বলার সময় নয়।'

শর্ত মানা হচ্ছে না :জেলা প্রশাসন থেকে ১০ দফা শর্ত দিয়ে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও অধিকাংশ শর্তই মানছেন না বিএনপি নেতারা। শর্তের অন্যতম হচ্ছে- ব্যানার-ফেস্টুন-পোস্টার সীমিত রাখা; তবে এরই মধ্যে সমাবেশস্থলের পাশের ভবন, নগরীর অন্য ভবন, দেয়াল পোস্টার, ব্যানার-ফেস্টুনে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। শর্ত ছিল, মাইক সীমিত রাখা ও উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার করা যাবে না। আয়োজকরা জানিয়েছেন, লাগানো হচ্ছে প্রায় ২০০ মাইক। রাস্তা বন্ধ করে সমাবেশের কর্মসূচি পালন থেকে বিরত থাকতে বলা হলেও বিএনপি নেতারা বলছেন, 'টাউনহল মাঠের বাইরে নগরীর সব রাস্তায় নেতাকর্মী অবস্থান না করলে লক্ষাধিক কর্মী কোথায় দাঁড়াবে?'

রাস্তায় মোটর শোভাযাত্রা ও মিছিল করা যাবে না- এমন শর্ত থাকলেও এরই মধ্যে নগরীতে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের শোডাউন শুরু হয়ে গেছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (কুমিল্লা বিভাগ) মোস্তাক মিয়া জানান, জেলা প্রশাসন থেকে যে ১০ শর্ত দেওয়া হয়েছে, এর অধিকাংশ মেনে সমাবেশ করা সম্ভব নয়। যে সমাবেশে লক্ষাধিক নেতাকর্মীর সমাবেশ ঘটবে, সেখানে মাইক সীমিত রাখা, শব্দদূষণ কমানো, মিছিল না করাসহ বেশ কিছু শর্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভাঙতে হবে। তবে আমরা সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে এ সমাবেশ সফল করতে সাংগঠনিকভাবে ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছি।

মঞ্চ তৈরির কাজে বিলম্ব :গত বুধবার সকাল থেকেই মঞ্চ তৈরির কাজ শুরু হলেও ওই দিন সন্ধ্যার পর থেকে মঞ্চ তৈরি আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। বিএনপি নেতারা বলেছেন, টাউনহল মাঠের একপাশে বইমেলা চলছে। তাই জেলা প্রশাসনের নির্দেশে মঞ্চ তৈরির কাজ আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার রাতে বইমেলা শেষ হওয়ার পর মঞ্চ তৈরির কাজ শুরু হবে।

এদিকে সমাবেশের নিরাপত্তার বিষয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার আবদুল মান্নান জানান, সমাবেশ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। সাদা পোশাকে থাকবে গোয়েন্দা নজরদারিও। সমাবেশস্থলের আশপাশে সুউচ্চ ভবনের ওপর থেকে পুলিশের পাহারা থাকবে। তিনি বলেন, যারা সমাবেশে আসবে, তারা যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা করতে না পারে কিংবা তাদের ওপরও কেউ যাতে আঘাত করতে না পারে- এসব বিষয়ে পুলিশের কড়া নজরদারি থাকবে।