ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

স্বামী-ছেলের মৃত্যু দেখেছেন ঊর্মি, নির্বাক যমজ ভাই

স্বামী-ছেলের মৃত্যু দেখেছেন ঊর্মি, নির্বাক যমজ ভাই

রতন প্রামাণিকের কোলে ছেলে সানি সমকাল

নাটোর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:০৫

চোখের সামনে স্বামী-সন্তানের মৃত্যু দেখেছেন। এ দৃশ্য ভুলতে পারছেন না ঊর্মি খাতুন। বুকের ধনকে ট্রেনে কাটা পড়তে দেখে তাকে বাঁচাতে গিয়েছিলেন স্বামী। দু’জনেই কাটা পড়েন। শিশুটিকে বাঁচাতে গিয়ে যাত্রী শরিফও মারা গেছেন। ঊর্মি জানান, ঘটনার সময় তিনি বাসে বসে ছিলেন। ট্রেনের আলোয় এ দৃশ্য জানালা দিয়ে দেখেছেন। এ কথা বলেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি।
ঊর্মিকে সান্ত্বনা দিতে পারছেন না পরিবারের কেউ। তিনি প্রলাপ বকছেন। গত শুক্রবার বিকেলে তিনি ছাড়াও ঢাকাগামী বাসে উঠেছিলেন স্বামী রতন প্রামাণিক (২৮) ও চার বছরের সন্তান সানি। পথে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে বাসটি থামে। ত্রুটি সারিয়ে তুলতে সময় লাগবে বলে জানান চালক ও সহকারী। স্ত্রীকে সিটে রেখে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে সানিকে রেললাইনের পাশে নিয়ে যান রতন। পরে নিজেও একই কাজ করার সময় ছেলে রেললাইনে উঠে পড়ে।
এক পর্যায়ে ট্রেন আসতে দেখে দৌড়ে ছেলেকে বাঁচাতে গেলে ছেলেসহ রতন ট্রেনে কাটা পড়েন। শিশুটিকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন একই বাসের যাত্রী শরিফ মণ্ডল। তিনিও ট্রেনের ধাক্কায় মারা যান। যমজ ভাই রতনকে হারিয়ে এখন পাগলপ্রায় মানিক। ভাই ও ভাতিজার মৃত্যুর খবরে নির্বাক তিনি। নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল আদগ্রামের আলাউদ্দিন প্রামাণিকের যমজ দুই সন্তান রতন ও মানিক।
রতনের জন্মের কয়েক মিনিট পর পৃথিবীর আলো দেখেন মানিক। সে হিসেবে রতন বড়। যমজ ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে পাগলের মতো আচরণ শুরু করেন মানিক। পরে তাঁকে চিকিৎসকের মাধ্যমে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়ানো হয়েছে। পরিবারটির সদস্যদের আহাজারিতে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে‌। প্রতিবেশীরা জানান, রতনরা দুই ভাই, দুই বোন। যমজ হওয়ায় বাবা-মা দুই ভাইয়ের নাম রাখেন মানিক-রতন।
ভগ্নিপতি রাশেদুল ইসলাম জানান, চাকরি পেয়ে স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে রতন ঢাকায় যাচ্ছিলেন। তাদের সঙ্গে নিহত শরিফ রাজশাহীর বেলপুকুর মাহিন্দ্রা গ্রামের আলম মণ্ডলের ছেলে। গত শুক্রবার রাতে কালিহাতীর আনালিয়াবাড়ি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এরপর থেকেই ঊর্মি ডুকরে কেঁদে উঠছেন আর ছেলের নাম ধরে ডাকছেন। প্রতিবেশীদের চোখও ভিজে উঠছে। গত বৃহস্পতিবারও তাদের সন্তানদের সঙ্গে খেলাধুলায় মেতেছিল সানি।
রাশেদুল জানান, উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে রতন বেকার ছিলেন। এক সময় ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছেন। কয়েক দিন আগে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি হয় তাঁর। যোগদানের পর স্ত্রী-ছেলেকে নিয়ে যেতে গত বৃহস্পতিবার বাড়ি আসেন। অনেক স্বপ্ন নিয়ে শুক্রবার কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা হন। তবে নিমেষেই সব চুরমার হয়ে গেছে। এ মৃত্যু পরিবারের কাছে দুঃস্বপ্ন।
স্বামী ও ছেলের শোকে ঊর্মি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানান চাচাতো ভাই মিনারুল। তিনি জানান, তাঁকে স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে। এদিকে শনিবার বাড়িতে রতন ও সানির মরদেহ আনা হলে কান্নার রোল পড়ে যায়। শত শত মানুষ ছুটে আসেন। কাফনের কাপড়ে পাশাপাশি ঢেকে রাখা হয়েছিল মরদেহ। তবে কেটে বিকৃত হওয়ায় কাউকে দেখানো হয়নি। বেলা ১১টার দিকে জানাজা শেষে জোনাইল কলেজপাড়া এলাকার কবরস্থানে দু’জনের মরদেহ দাফন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×