ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

গাছি সংকট ও ভেজালে গুড়ের দুর্দিন

গাছি সংকট ও ভেজালে গুড়ের দুর্দিন

.

হাসানউজ্জামান ও রাশেদুল হাসান কাজল, ফরিদপুর

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:০৯

আলমাস শেখের বয়স এখন ৬৫ বছর। এখনও খেজুর গাছ কাটেন। এক দিনে ২৫টির মতো গাছ কাটতে পারেন। ১০০ লিটার পর্যন্ত রস সংগ্রহ করেছেন। এ রস খেতে বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ আসেন, কিনে নিয়ে যান। প্রতিবেশীদেরও দেন। তিনি বলছিলেন, মাঘ মাসেও রস পাওয়া যাবে, এরপর কমতে থাকবে। বিক্রির পরে যা থাকে, তা দিয়ে গুড় তৈরি করেন। এক লিটার রস বিক্রি হয় ২০০ টাকায়। আর গুড়ের কেজি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা।
এক সময় শীতের সকালে খেজুর রসের হাঁড়ি নিয়ে রাস্তা দিয়ে যেতে দেখা যেত আলমাসের মতো অনেক গাছিকে। ফরিদপুরের বিভিন্ন বাজারে রস বিক্রি করতেন তারা। পাওয়া যেত গুড় ও পাটালি। পথের ধারে ছিল প্রচুর গাছ। গাছিরা রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করতেন। পিঠাপুলির কদর ও স্বাদ ছিল দারুণ। গত এক দশকে বাড়তি জনসংখ্যা, আধুনিকতার ছোঁয়াসহ নানা কারণে কমেছে গাছ। কমছে গাছিও। ফলে উৎপাদন কমছে দ্রুত এবং আগের ঐতিহ্যও হারিয়ে যাচ্ছে।
ফরিদপুরের ৯ উপজেলার মেঠোপথ, বাড়ির আঙিনা, আইলে আগে চোখে পড়ত সারি সারি খেজুর গাছ। মাথার দিকে বিশেষ কায়দায় ছেঁটে রস সংগ্রহের মাটির হাঁড়ি পাততেন গাছি। এখন চোখে পড়ে হাতেগোনা কিছু গাছ। গাছির সংখ্যাও কমেছে। কিছু এলাকায় অল্প গাছ কোনোমতে টিকে আছে। ফলে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য রস ও গুড়ের খ্যাতি কমছে। গাছিরা যাচ্ছেন অন্য কাজে। নতুন কেউ এ কাজে আসছেন না। ফলে বাজারে অনেক গুড় মিললেও ভেজালের ভিড়ে আসল পাওয়া কঠিন।
আলফাডাঙ্গার পাঁচুড়িয়া গ্রামের মফিজুর রহমান (৬৬) প্রায় ৩৫ বছর ধরে রস সংগ্রহ করছেন। তবে আগের মতো গাছ না থাকায় অল্প কয়েকটি গাছের রস থেকে গুড় তৈরি করেন। শীতে মাসতিনেক এ কাজ করেন। বাকি সময় নদীতে মাছ ধরেন।
স্থানীয়রা বলছেন, জেলায় এখনও যে গাছ আছে, সে তুলনায় গাছি নেই। অথচ এলাকার গুড়ের সুনাম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রয়েছে বিদেশেও। তবে চাহিদার তুলনায় ভালো গুড় ক্রেতাদের দিতে পারেন না গাছিরা। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ফরিদপুরে চার লাখের মতো খেজুর গাছ আছে। এর মধ্যে এক লাখ থেকে রস সংগ্রহ হচ্ছে। তিন লাখ গাছ কাটা হয়নি। এবার ২০ হাজার কেজি গুড় উৎপাদন হতে পারে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। ২০১৯ সালে ৩০ হাজার কেজির বেশি গুড় উৎপাদন হয়েছিল। করোনাকালে সব ফসলের উৎপাদন ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও গুড় কমেছে।
ফরিদপুর পৌরসভার আদমপুর গ্রামের কুমার নদের ওপরের সেতু পার হলেই রাস্তার দুই পাশে চোখে পড়ে প্রায় ৫০টি গাছ। এর মালিক নেই। এ বছর পাবনা থেকে তিনজন গাছি এসেছেন গাছগুলো কাটতে। তারা ডিসেম্বরের শুরুতে গ্রামের এক বাড়িতে উঠেছেন। গঙ্গাবর্দীর কৃষি ইনস্টিটিউট এলাকায় প্রায় দেড় হাজার গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। এ গাছও বাইরের গাছিরা কেটে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করেন। 
রাজশাহীর বাঘা থেকে দিঘায় এসেছেন গাছি মো. লালন আলী। তাঁর ভাষ্য, নভেম্বরের শেষদিকে দু’জন সহযোগী নিয়ে এসেছেন। দেড় শতাধিক গাছ থেকে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করছেন। তাদের মতো মৌসুমে নাটোর, পাবনা, যশোর ও রাজশাহী থেকে অনেকে এসে এ অঞ্চলের গাছ কাটেন।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরিতে ব্যস্ত কিছু গাছি। রস প্রায় দেড় ঘণ্টা জ্বাল দিলে গুড় হয়। অনেক ক্রেতাকে অপেক্ষায়ও থাকতে দেখা যায়। গাছি সেলিম মণ্ডল ও আরশাদ শেখ রাজশাহী থেকে এসেছেন। তারা সাড়ে তিন 
মাসে খরচ বাদে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরবেন বলে জানান। তবে ঝুঁকির কারণে অনেকে পেশা ছেড়েছেন বলে দাবি তাদের।
বাদুড় যাতে রসের হাঁড়িতে বসতে বা মুখ দিতে না পারে, সেজন্য নীল কাপড় দিয়ে মুখ বেঁধে দেন রাজশাহীর গিয়াস মণ্ডল। তিনি বলেন, নিপা ভাইরাস প্রতিরোধে এমন ব্যবস্থা। ১৫০ গাছের মধ্যে দিনে ৮০টি থেকে রস সংগ্রহ করেন। এতে ২৫০ লিটার রস পাওয়া যায়। গুড় হয় ১৫ কেজি।
ভাঙ্গার ভাঙ্গারদিয়া, সদরদী ও ভদ্রকান্দা গ্রামের পুরোনো গাছি সুজন পাল, আক্কাস আলী ও তোতা মিয়া। গাছ কমার জন্য জনসংখ্যা বৃদ্ধি দায়ী বলে মত তাদের। বাড়ির জায়গা ও কাঠের প্রয়োজনে বাগান উজাড় হচ্ছে জানিয়ে তারা বলছেন, আগে প্রায় বাড়িতেই গাছি ছিল। তবে বেশির ভাগ পুরোনো গাছি মারা গেছেন। তাদের ছেলে-মেয়েরা অন্য পেশায় যাওয়ায় 
পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।
গাছ ও গাছি সংকটে গুড়ের উৎপাদন কমছে স্বীকার করে ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, খেজুর গাছ লাগানোর পাশাপাশি রোপণে মানুষকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। নিপা ভাইরাস প্রতিরোধে ক্যাম্পেইন চলছে। বাদুড় যাতে সংক্রমণ করতে না পারে, সেজন্য কাণ্ড ও হাঁড়ি ঢেকে রাখতে পরামর্শ দেওয়া হয়।
এ কর্মকর্তার ভাষ্য, খেজুর গাছে ডালপালা হয় না, আইলে লাগানো যায়। পরিচর্যাও লাগে না। গাছ তেমন কমেনি। তবে গাছির অভাবে রস ও গুড় কমেছে। গাছিরা যে প্রক্রিয়ার উৎপাদন করেন, তাতে লাভ হয় না। বাজারে কম দামের ভেজাল গুড় বেড়েছে। এতে গাছিরা অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। আগের গাছিরা বয়সের ভারে অক্ষম। ডিজিটাল যুগে গুড় ব্যবসা বাণিজ্যিক হয়ে গেছে। এখন বাজারে অনেক উদ্যোক্তা। তারা গুড় তৈরি করে নিজেরা বিক্রি করেন। অনলাইনে তাদের বিচরণ।
বাজারে চিনি ও কেমিক্যাল মেশানো কম দামের গুড় পাওয়া যায় জানিয়ে উদ্যোক্তা উম্মে হাবিবা মৌ বলেন, সমস্যা হলো ভোক্তারা ভালো গুড় চিনতে পারেন না। এজন্য তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে জ্বালিয়ে গুড় তৈরির প্রক্রিয়া শেষ করে বিক্রি করেন। শহরের অম্বিকাপুর বাজারের ব্যবসায়ী কালাম মোল্লার কথায়, ‘আমরা বাজার থেকে গুড় কিনে বিক্রি করি। গাছিদের কাছ থেকেও কেনা হয়। তবে তাদের কাছে সব সময় পাওয়া যায় না।’
এ বিষয়ে জেলা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. সোহেল শেখ বলেন, চিনি ও কেমিক্যাল মেশানো গুড়ের বিষয়টি পরীক্ষা ছাড়া বলা সম্ভব নয়। তবে আলীপুরের একটি বাসায় অভিযান চালানো হয়েছে। সেখানে ঝোলা গুড় কিনে চিনি মিশিয়ে পাটালি তৈরির পর বিক্রি করা হতো। বাজারে ভালো ও চিনি মেশানো গুড় পাওয়া যায়। ভালোগুলো ক্রেতাকে চিনতে হবে।

আরও পড়ুন

×