ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন সহকারী চক্ষু রোগী দেখছেন নার্স

ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন সহকারী চক্ষু রোগী দেখছেন নার্স

.

 তৌহিদুর রহমান, যশোর 

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:২৯

মঙ্গলবার ঘড়ির কাঁটা সকাল ১০টা বেজে ৮ মিনিট। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগের দন্ত চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষা করছেন শিশুসহ নানা বয়সী ১৫ রোগী। এর মধ্যে ৯ বছর বয়সী শিশু সিনথিয়া মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। শিশুটির মা নাজমা বেগম জানান, গত কয়েক দিন মেয়েটার গলায় ও দাঁতে প্রচণ্ড ব্যথা। হাসপাতালে এসেছি সকাল পৌনে ৮টায়। দুই ঘণ্টা পার হয়ে ১০টা বেজেছে, এখনও ডাক্তার চেম্বারে আসেননি। ব্যথায় মেয়েটা কাতরাচ্ছে। বহির্বিভাগে টিকিট কেটে অসহায় চোখে চিকিৎসকের অপেক্ষা করছিলেন উপজেলার গদখালী বেনেয়ালী থেকে আসা ওই নারী। 
একই সময়ে উপজেলার কায়েমকোলা গ্রাম থেকে সন্তানসম্ভবা স্ত্রী ছোনিয়া খাতুনকে নিয়ে গাইনি চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন স্বামী মহব্বত হোসেন। তিনি জানান, পরীক্ষার জন্য সকাল থেকে না খেয়ে খালি পেটে রয়েছেন স্ত্রী। ওই দিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত সরেজমিন ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতাল চত্বরে অবস্থান করে বহির্বিভাগের কোনো চেম্বারে চিকিৎসকদের দেখা যায়নি। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সকাল ৮টা থেকে ২টা পর্যন্ত বহির্বিভাগের চেম্বারে চিকিৎসকদের রোগী দেখার কথা। 

উপস্থিত রোগীদের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের আলাপকালে সকাল ১০টার দিকে বহির্বিভাগে শিশু বিভাগের চেম্বারে আসেন শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. টিপু সুলতান। তিনি জানান, সকালে ডাক্তারদের অনেক কাজ থাকে। এ জন্য বহির্বিভাগের চেম্বারে আসতে দেরি হয়। এই চিকিৎসক ১০টায় চেম্বারে প্রবেশ করলেও বাকিরা পৌনে ১১টার দিকে প্রবেশ করেন বলে সরেজমিন দেখা গেছে।
৫০ শয্যার ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কনসালট্যান্ট ১০ পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন চারজন ও মেডিকেল অফিসার সাতজন। এই সাতজনের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোস্টার অনুযায়ী চেম্বার করেন। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, নাক কান গলা, শিশু, গাইনি ও মেডিসিন বিভাগের ১০ জন চিকিৎসক বহির্বিভাগে চেম্বারে বসার কথা ছিল। এই হাসপাতালটি ঝিকরগাছা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী মনিরামপুর ও শার্শা উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসা।

হাসপাতালের বহির্বিভাগের ৪৪ নম্বর কক্ষ। এই চেম্বারে নিয়মিত রোগী দেখেন সহকারী সার্জন তাসনিম মাহমুদ। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত তিনি চেম্বারে আসেননি। এই চেম্বারের সামনে অপেক্ষায় থাকা ষাটোর্ধ্ব আগেস্টিক মণ্ডল, এসেছেন উপজেলার নির্বাসখোলা গ্রাম থেকে। ডায়াবেটিসের এই রোগী বলেন, টিকিট কেটে বসে আছি অনেকক্ষণ। চিকিৎসক আসেননি। 
এ কথার সত্যতা জানতে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, চেম্বারের ভেতরে মানুষের জটলা। চিকিৎসকের সহকারী মোছা. সুরাইয়া রোগীদের পুরোনো ব্যবস্থাপত্র দেখে ওষুধ দিচ্ছেন আর রোগীরা সেই ওষুধ নিয়ে চলে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান ওই সহকারী।

বহির্বিভাগে চক্ষু বিভাগের চেম্বারে প্রবেশ করতেই দেখা গেল এক নার্স রোগী দেখছেন। অন্য একজন নার্স রোগীর ব্যবস্থাপত্র দেখে ওষুধ দিচ্ছেন। চক্ষুসেবা নিয়ে বের হওয়া টুম্পা বেগম নামে এক স্বজনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, টিকিট কেটে এই কক্ষে প্রবেশ করলে এক নার্স ছেলের চোখ পরীক্ষা করে ওষুধ দিয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, চোখের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ রোগীর এভাবে চিকিৎসাসেবা তো আমরা চাইনি। সিনিয়র নার্স শামীমা নাসরীন জানান, এখানে চক্ষু চিকিৎসক নেই। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে আমরা রোগীর উপসর্গ যশোর জেনারেল হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞদের জানাই। তারা ব্যবস্থাপত্র দিলে ওষুধ দিয়ে থাকি।

 সিজার ছাড়া হয় না অন্য অপারেশন
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কনসালট্যান্ট ১০ পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন চারজন। সিনিয়র স্টাফ নার্স ৩২ পদের বিপরীতে ২২ জন, তৃতীয় শ্রেণির ২৯ পদের বিপরীতে ১৮ জন, চতুর্থ শ্রেণির ২৬ পদের বিপরীতে ১০ জন কর্মরত আছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে হাসপাতালটিতে হয় না বড় কোনো অপারেশন। নেই নিরাপত্তা প্রহরী। দু’জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে এই হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখতে হচ্ছে। জনবল সংকটে ধুঁকছে উপজেলার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেটি। 

এক্স-রে সেবা বন্ধ
হাসপাতালে রয়েছে এক্স-রে ফিল্মের সংকট। ফলে রোগীদের পরীক্ষা না করিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। এ ছাড়া রয়েছে ওষুধ সংকট। হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজি ও রেডিওগ্রাফি বিভাগের শামসুর আলম বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে ফিল্মের সংকট চলছে। এতে হাসপাতালে রোগীরা বিপাকে পড়েছে। 

কী বলছে কর্তৃপক্ষ
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. রশিদুল আলম বলেন, প্রতিদিন বহির্বিভাগে চিকিৎসকরা দেরি করে আসেন– এই অভিযোগ মিথ্যা। অনেকের ওয়ার্ডে ভিজিটে যান। তবে আজ মিটিং থাকায় দেরি হয়েছে। তিনি জানান, এখানে চিকিৎসক, শয্যা ও জনবল সংকট রয়েছে। এসব বিষয়ে মন্ত্রালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। চিকিৎসকের অভাবে সিজার ছাড়া অন্য কোনো অপারেশন হয় না বলে জানান ওই কর্মকর্তা। 

যশোর সিভিল সার্জন ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, চিকিৎসকসহ যারা সময়মতো কর্মস্থলে আসবেন না এবং কাজে গাফিলতি করবেন তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×