কিশোরগঞ্জ শহরের স্টেশন রোডের নিয়ামত স্টোরের মালিক শাহীন মিয়া। তিনি নিয়মিত রাত ১২টা বা তারও পরে শোলাকিয়া এলাকায় বাসায় ফেরেন। শাহীন মিয়া বলছিলেন, মধ্যরাতে পুরান থানা এলাকায় ডিলার ইছাম উদ্দিনের দোকানের সামনে কুয়াশার মধ্যে কিছু মানুষকে প্রায়ই লাইন ধরে অপেক্ষা করতে দেখেন। অথচ দোকান খুলবে পর দিন সকাল ১০টায়। সকালে এলে বড় লাইনের পেছনে পড়ে চাল-আটা পাবেন না। এ জন্য রাত থেকেই লাইনে দাঁড়ান তাঁরা। বাজারে জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতিতে ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়ায় তাঁরা এভাবে মধ্যরাতে লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।

কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় আমন ধান অনেকাংশে গুছিয়ে এনেছেন কৃষকরা। বিক্রিও করেছেন অনেকে। বছরের এ সময়টায় চালের দাম থাকে নিম্নমুখী। এবার সে লক্ষণ নেই। আমন মৌসুমেও চড়া চালের বাজার। আটার দামও বেড়েছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। এতে ওএমএসের দোকানে রাত থেকে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লাইন। চাহিদা মেটাতে গলদঘর্ম অবস্থা ডিলারদেরও।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওএমএস ডিলারের কাছ থেকে একজন পাঁচ কেজি করে চাল ও তিন কেজি আটা পাচ্ছেন। মোটা চাল ৩০ টাকা ও আটা ২৪ টাকা কেজি কিনতে পারছেন দরিদ্ররা। এ জন্য নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। তবে এই সামান্য পরিমাণ চাল ও আটা দু'একদিনেই শেষ হয়ে যায়। বাজারে কম দামের মোটা চালও চাহিদামতো মিলছে না।

শহরের কাচারি বাজারের ভুলু ট্রেডার্সে গিয়ে জানা যায়, বিভিন্ন জাতের চালের মধ্যে সর্বনিম্ন দামে নতুন 'ব্রিধান-৪৯' চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২ টাকা কেজি দরে। বোরো মৌসুমের 'ব্রিধান-২৮' মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। 'ব্রিধান-২৯' ৫৮ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মুদি দোকানে খোলা আটা বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি। প্যাকেটজাত আটা ৬৮ থেকে ৭০ টাকা। ক্ষেত্রবিশেষ আরও বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে এমন চড়া দামের কারণে অল্প পরিমাণে হলেও চাল ও আটা কিনতে দীর্ঘ লাইন পড়ে যাচ্ছে ওএমএসের দোকানে। জানা গেছে, আগে যারা কখনও এ লাইনে দাঁড়াননি, তাঁরাও এখন বাধ্য হচ্ছেন দাঁড়াতে।

গত বুধবার দুপুরে জেলা শহরের কাচারি বাজারের ওএমএস ডিলার এনামুল হকের দোকানের সামনে দেখা যায়, নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। এনামুল হক জানান, তাঁর দোকানে প্রতিদিন এক টন করে চাল ও আটা বরাদ্দ দেওয়া হয়। চাল দেওয়া যায় ২০০ জনকে। আটা পান ৩৩৩ জন। বরাদ্দের তুলনায় ক্রেতার সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। লাইনে দাঁড়িয়েও অনেককে খালি হাতে ফিরতে হয়। অনেকে ভোরে এসে দাঁড়ান। বরাদ্দ বাড়ানো হলে চাহিদা মেটানো সম্ভব।

ডিলার এনামুল জানান, তিন সপ্তাহ আগেও আটা ছিল ১৮ টাকা কেজি, এখন ২৪ টাকা। তবে চালের দাম আগের মতোই আছে। সপ্তাহের শুক্র-শনিবার ছাড়া বাকি পাঁচ দিন চাল-আটা বিক্রি হয়। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার বরাদ্দ না পাওয়ায় বিক্রি বন্ধ ছিল। কিশোরগঞ্জ পৌর এলাকায় ১০ জন ডিলার রয়েছেন।

এ কথা বলার সময় রোকেয়া আক্তার, হালিমা বেগমসহ কয়েকজনকে চাল ও আটা না পেয়ে মন খারাপ করে ফিরে যেতে দেখা যায়। তাঁরা জানান, দীর্ঘক্ষণ লাইনে অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু আগেই পণ্য শেষ হয়ে গেছে।

চালের দামের বিষয়ে ভুলু ট্রেডার্সের মালিক শ্যামল দত্ত এবং অপর ব্যবসায়ী রমজান মিয়া জানান, চালের দাম নির্ভর করে চালকল মালিকদের ওপর। আমন ধান প্রথম দিকে ১২০০ টাকা মণ দরে কিনলেও এখন বেড়ে ১৩০০ টাকা হয়েছে। এসব চাল বাজারে এলে দাম কমত। কিন্তু মালিকরা ধান মজুদ করছেন, চাল বাজারে ছাড়ছেন না। সরকারের সঙ্গে সভা হলে ধানের দামের হিসাব দিয়ে চালের ব্যবসায় কম মুনাফার কথা বলেন। কিন্তু কুড়া বা গোখাদ্যে বাড়তি মুনাফার হিসাব গোপন রাখেন। সরকার পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখলে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, সরকার ওএমএসের পাশাপাশি ভিজিএফ ও টিসিবি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এক কোটি মানুষকে মাসে টিসিবির পণ্য দেওয়া হচ্ছে। সামনের কঠিন সময়ের কথাও ভাবতে হচ্ছে। চাইলেই কতটুকু বরাদ্দ বাড়ানো সম্ভব, বোঝা যাচ্ছে না। তবে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়ে সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবেন।