হাতের আঙুল ফোলা ও ব্যথা নিয়ে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছিলেন রওশন আরা। বহির্বিভাগে চিকিৎসক দেখানোর পর এক্স-রে করতে বলা হয় তাঁকে। হাসপাতালের এক্স-রে চালু থাকলেও বলা হয় বাইরে থেকে করে আনতে। হাসপাতালের গেটের সামনে একটি প্রাইভেট ক্লিনিক থেকে ৪৫০ টাকা দিয়ে এক্স-রে করতে বাধ্য হন দরিদ্র এই নারী।

পেটে সমস্যা নিয়ে ফারজানা বেগম ভর্তি হয়েছেন কয়েকদিন আগে। বললেন, সব ওষুধ ও স্যালাইন দোকান থেকে কিনতে হয়। সাপ্লাই না থাকার অজুহাতে কিছুই দেয় না হাসপাতাল থেকে। গরিব মানুষ হয়েও কোনো সহায়তা পাচ্ছি না। রাতে বড় সমস্যা হলেও চিকিৎসক আসেন না। সব পরীক্ষাও বাইরে থেকে করতে হয়েছে।

সরেজমিন এ হাসপাতাল ঘুরে এ রকম নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। চিকিৎসকদের সময়মতো অফিসে না আসা, রোগীদের খাবারের টাকায় ভাগ বসানো, হাসপাতালের আবাসিক ভবনে না থাকাসহ অসংখ্য অভিযোগ করেন রোগী ও তাঁদের স্বজনরা।

নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে গত ২৮ অক্টোবর হাসপাতালটির ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা জোবাইয়া ফারজানাকে নেত্রকোনা জেলা হাসপাতালে বদলি করা হয়। চিঠিতে দুই কার্যদিবসের মধ্যে তাঁকে ছাড়পত্র নেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও তিনি না নিয়ে দায়িত্বে বহাল ছিলেন। পরে গত ১১ নভেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সেই বদলির আদেশ বাতিল করে উল্টো তাঁকে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার (আরএমও) পূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়। এতে ক্ষোভ বিরাজ করছে চিকিৎসক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও নার্সদের মধ্যে।

আরএমওর ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালে থাকার নিয়ম থাকলেও তিনি থাকেন জেলা শহরে। প্রতিদিন দেরিতে আসেন। তাঁর নাগাল সহজে পান না রোগী ও তাঁদের স্বজনরা। সাত বছরের বেশি একই জায়গায় চাকরি করা ফারজানা কোনো নিয়ম মেনে চলতে অভ্যস্ত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিজস্ব গাড়িতে আসা-যাওয়া করেন। আবার রোগী দেখেন পার্শ্ববর্তী ভেড়ামারা উপজেলায়।

১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত মিরপুর উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার। তাঁদের চিকিৎসার প্রধান অবলম্বন উপজেলা হাসপাতাল। ৩১ শয্যার হাসপাতালটি বিএনপি আমলে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। চিকিৎসক বাড়লেও অন্যান্য লোকবলের ঘাটতি রয়েছে। হাসপাতালটিতে মোট চিকিৎসক আছেন ১৪ জন। এর মধ্যে ছুটিতে দু'জন।

এ ছাড়া জুনিয়র কনসালট্যান্টসহ কয়েকটি পদ ফাঁকা রয়েছে।

সম্প্রতি সকাল সাড়ে ৮টায় গিয়ে দেখা যায়. জরুরি বিভাগে ঝাড়ূ দেওয়ার কাজ চলছে। ৯টার কয়েক মিনিট আগে তালা খোলা হয়। তালা খুলতেই রোগীরা ঢুকে পড়েন। চিকিৎসকদের রুমও খোলা হয়েছে একই সময়ে। রোগীরা আসছেন একে একে। তবে এর আগে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি জরুরি বিভাগের বারান্দায় উঠে পড়েন। সেখানেই গাড়ি রাখেন তাঁরা। তাঁদের সংখ্যা সাত থেকে আটজনের মতো। এর মধ্যে চিকিৎসকরা চলে আসেন। ডিজিটাল হাজিরা দিয়ে দু'জন নারী ও তিনজন পুরুষ চিকিৎসক ৯টার পর রোগী দেখা শুরু করেন। রোগী দেখা অবস্থায় ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা উপহারসামগ্রী নিয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েন চিকিৎসকদের কক্ষে। এ সময় রোগী দেখা বন্ধ করে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন চিকিৎসকরা।

সাড়ে ৯টার দিকে অফিসে ঢোকেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা পীযূষ কুমার সাহা। সকাল ৯টার দিকে তাঁর রুম খুলে সিলিং ফ্যান চালিয়ে দেওয়া হয়। সে সময় রুমে কেউ ছিল না। এভাবে আধা ঘণ্টা ফ্যান ও একাধিক লাইট চলছিল। ১০টার আগে হাসপাতালের আরএমও ফারজানা ঢোকেন তাঁর রুমে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেখানেই গল্প করেন ও কফি খান।

এ সময় ডিসপেনসারি, আলট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে রুম বন্ধ ছিল। রোগীরা পরীক্ষার জন্য এসে ফিরে যান, পরে তাঁরা বাইরে ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনেন।

হাসপাতালে নথি অনুযায়ী গড়ে প্রতিদিন ৩০ জনের মতো রোগী ভর্তি থাকে। তাঁদের জন্য সকালে নাশতা দেওয়া হয় কলা ও পাউরুটি। দুপুরে রুই মাছ, সবজি ও ডাল দেওয়ার কথা। রান্নাঘরে গিয়ে দেখা যায় পাঁচটি ছোট ছোট রুই মাছ কেটে রাখা হয়েছে।

সেখানে দায়িত্বরত একজন বলেন, ঠিকাদার সেলিম চৌধুরী বাজার করে দেন। তিনি বড় রুই মাছ না দিয়ে ছোট সাইজের এই রুই মাছ দিয়েছেন। এ মাছই রোগীদের দেওয়া হবে। এ সাইজের রুই মাছের বাজারে দাম ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি। অথচ বিল তোলেন প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। আর ব্রয়লার মুরগির জন্য বিল তোলেন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি। এভাবে অন্যান্য আইটেমের দামও অনেক বেশি নেন। গড়ে নিয়মিত ৩০ জন রোগী ভর্তি থাকলেও আরএমওর সহযোগিতায় ঠিকাদার ৪০ থেকে ৪৫ জন রোগীর বিল তোলেন। সেলিম অবশ্য দাবি করেন, তিনি ভালো খাবার দেন।

হাসপাতালের একাধিক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'এখানকার দুটি আবাসিক ভবনে কেউ থাকেন না। ফলে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা পীযূষসহ কোনো চিকিৎসকই আবাসিক ভবনে থাকেন না। দেখা গেছে, কেউ না থাকায় ভবনের দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে গেছে। ময়লা-আবর্জনা ও ঝোপঝাড় জমেছে। বেশিরভাগ চিকিৎসক জেলা শহরে প্র্যাকটিস করায় কেউ ভবনে থাকতে চান না।

হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'আমার সাত বছরের চাকরিজীবনে কোনো আরএমওকে হাসপাতালে থাকতে দেখিনি। বর্তমান ম্যাডামও থাকেন না।' ডা. পীযূষ সাহা জানান, আবাসিক ভবন দুটি থাকার মতো অবস্থায় নেই। প্যাথলজি সেবা সচল রয়েছে, তবে কিছু মেশিন ভালো নেই। খাবারের মান নিয়ে সমস্যা থাকলে তিনি দেখবেন। আরএমও ফারজানার দাবি, হাসপাতালটি আগের চেয়ে ভালো চলছে। রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছেন। কোনো অনিয়ম হচ্ছে না।