ভুয়া শিপিং বিল তৈরি করে রপ্তানিতে সরকারি প্রণোদনার ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের মূল হোতা ঢাকার রপ্তানিকারক ইলিয়াছ মামুন মিয়াজী ও চট্টগ্রামের সহিদুল ইসলাম সেলিম। ঢাকা ও চট্টগ্রামে বসে তাঁরা ৯১টি ভুয়া রপ্তানি চালান দেখিয়ে আত্মসাৎ করেন প্রণোদনার অর্থ। সাড়ে চার বছর ধরে জালিয়াতি ও প্রতারণা করে অর্থ লোপাট করে গেলেও কেউ কিছু আঁচ করতে পারেননি। ভুয়া রপ্তানির আড়ালে সাড়ে চার বছরে কত কোটি টাকা মানি লন্ডারিং করেছেন, তার তদন্তে মাঠে এনেছে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। মামুনের এনআইডি ব্যবহার করে নামে-বেনামে থাকা সব ব্যাংকে যত হিসাব আছে, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করে পুলিশ। প্রণোদনা লোপাটে ১৩টি সিএন্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন তিনি। কাস্টমস ও সিএন্ডএফ এজেন্টদের চোখে ধুলো দিয়ে একের পর এক জালিয়াতি করে গেছে প্রতারক চক্র।

চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান বলেন, ভুয়া শিপিং বিল তৈরি করে সরকারের কোটি কোটি প্রণোদনার অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় রপ্তানিকারক ইলিয়াছ মামুন মিয়াজীর বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারসহ মানি লন্ডারিং করার তথ্য পাওয়া গেছে। তাই তাঁর এনআইডি ব্যবহার করে দেশের সরকারি-বেসরকারি যে কোনো ব্যাংকে নামে-বেনামে যত ব্যাংক হিসাব রয়েছে, সব ব্যাংক হিসাবের অর্থ লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তার পরই জানা যাবে তিনি কত কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের সঙ্গে জড়িত।

সিএন্ডএফ এজেন্ট সাদাত এন্টারপাইজের মালিক আমিনুল ইসলাম বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানসহ ১৩টি প্রতিষ্ঠানের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে জালিয়াতি ও প্রতারণা করে কোনো ধরনের পণ্য রপ্তানি না করেই প্রণোদনার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মামুন চক্র। সম্প্রতি কাস্টমস থেকে একটি চিঠি পাওয়ার পরই জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে সবার পক্ষে আমি বাদী হয়ে নগরের বন্দর থানায় একটি মামলা করেছি।

অভিযুক্ত ইলিয়াছ মামুন মিয়াজী বলেন, রপ্তানি প্রণোদনা আত্মসাতের অভিযোগ মিথ্যা ও অসত্য, ভিত্তিহীন। পণ্য রপ্তানি করেই মামুন এন্টারপ্রাইজ সরকারি আর্থিক প্রণোদনা গ্রহণ করেছে। আদালতে আমি প্রমাণ করে দেব।

সাড়ে চার বছরে ৯১ জালিয়াতি

২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের ১২ মার্চ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার বছরে কাস্টমস হাউসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে অনৈতিকভাবে বিভিন্ন সিএন্ডএফ এজেন্টের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে প্রবেশ করে রপ্তানিকারক মামুন চক্র। অ্যাসাইকুডায় প্রবেশ করে ৯১ ভুয়া চালানের ডকুমেন্ট তৈরি করে। সিএন্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাদাত এন্টারপ্রাইজের নামে ২০টি চালান, গ্রিন ভ্যালি ইন্টারন্যাশনালের নামে ১৮টি, ফেয়ার ট্রেডিংয়ের নামে ১৫টি, এসএ এন্টারপ্রাইজের নামে ১০টি, মির্জা ট্রেডিংয়ের নামে ৯টি, এমওএস ইন্টারন্যাশনালের নামে সাতটি, প্রতিদিন কোম্পানি বিডি লিমিটেড ও ত্রি-স্মার্ট অ্যান্ড কোম্পানির নামে তিনটি, পিপলস ট্রেডিং করপোরেশনের নামে দুটি, এক্সকো বোনো ইন্ডাস্ট্রিজ, এসএন্ডএস এজেন্সি, লোকনাথ শিপিং লাইন্স লিমিটেড ও সুমন ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের নামে একটি করে চালানের ভুয়া বিল বানায়। তার পর রপ্তানি দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে।

প্রণোদনা লোপাটের মূল অভিযুক্ত মামুন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার পূর্ব জোড়কানন ইউনিয়নের মিয়াজী বাড়ির ইসমাইল মিয়াজীর সন্তান। ঢাকার মতিঝিল ইনার সার্কুলার রোডের ২৯২ ফকিরাপুল এলাকার শতাব্দী সেন্টারের নিচতলায় ২০৯ নম্বর কক্ষে তাঁর নামে মামুন এন্টারপ্রাইজ অফিস। গত ১১ আগস্ট আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠান। গত ২২ নভেম্বর হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে কারামুক্ত হন এই প্রতারক। অপর হোতা কুমিল্লার লাকসামের সেলিম পলাতক রয়েছেন।