ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

স্বামীকে আটকে স্ত্রীকে ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ছাত্রলীগ নেতাসহ ৪

স্বামীকে আটকে স্ত্রীকে ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ছাত্রলীগ নেতাসহ ৪

.

 জাবি প্রতিনিধি 

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০০:২৬

ধর্ষণের ঘটনায় আবারও উত্তাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর অপকর্মের প্রতিবাদে ফের একযোগে বিক্ষোভে নামলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এবার আবাসিক হলে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করা হলো। শনিবার রাতের এ ঘটনায় গতকাল রোববার দিনভর উত্তাল ছিল ক্যাম্পাস।

ধর্ষণের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান, একই বিভাগের সাগর সিদ্দিকী ও হাসানুজ্জামান এবং উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাব্বির হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। পলাতক রয়েছেন দুই আসামি। তারা হলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মুরাদ এবং বহিরাগত মামুনুর রশিদ।

আন্দোলন শুরুর পর ছয়জনের সনদ বাতিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তিনজনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। সনদ বাতিল করা ছয়জনের মধ্যে উল্লিখিত পাঁচ শিক্ষার্থী ছাড়াও আছেন ছাত্রলীগ নেতা শাহপরাণ। অভিযোগ  উঠেছে ছাত্রলীগ নেতারা একের পর এক অপকর্ম চালালেও নির্বিকার ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শাস্তির নজির না থাকায় ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ ঘটাল শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী। আসামিদের পালাতে তিন ছাত্রলীগ নেতা সহায়তা করেন বলে অভিযোগ করেছেন বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা। একাধিক শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতা জানান, মোস্তাফিজ এবং মামুন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইয়াবার কারবার করেন। এ কারণে মামুন প্রায়ই হলে আসতেন। 

এদিকে অধিকতর তদন্তে চার সদস্যের কমিটি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। মামলাও করেছে। গতকাল আন্দোলন শুরুর পর সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত হয়, পাঁচ দিনের মধ্যে অবৈধরা হল না ছাড়লে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলম বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সনদ স্থগিতের পাশাপাশি তাদের ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত করা হয়েছে। ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ ও অস্থায়ী দোকানপাট নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

প্রধান সন্দেহভাজন মোস্তাফিজ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেলের অনুসারী হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত। ধর্ষণের ঘটনায় তাঁকে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। মীর মশাররফ হলের ৩১৭ নম্বর রুমে মোস্তাফিজ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক মুরাদ হোসেন থাকেন। ধর্ষণের ঘটনা জানাজানির পর হলের ফটকে প্রশাসনের লাগানো তালা ভেঙে জড়িতদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করার অভিযোগ উঠেছে ওই হলের ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে।

এর আগে ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুরতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হন এক নারী। এ ঘটনায় সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এ নিয়ে ছাত্রলীগের কয়েক নেতাকর্মীর নামে মামলায় বিচার চলছে। এদিকে জাহাঙ্গীরনগরে ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। উদ্বেগ জানিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচারের তাগিদ দিয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। 

কী ঘটেছিল
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহিল কাফী জানান, ভুক্তভোগী নারী ও তাঁর স্বামী আশুলিয়ায় ভাড়া বাসায় থাকেন। পূর্বপরিচয়ের সূত্রে একই বাসায় পাশাপাশি কক্ষে ভাড়া থাকেন মামুন। গত শনিবার মামুন ওই নারীর স্বামীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেকে আনেন। তিনি ক্যাম্পাসে এলে মোস্তাফিজ ও মুরাদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে মামুন ভুক্তভোগীর স্বামীকে বলেন, সাভারের একটি ইলেকট্রনিকসের দোকানে কিছু টাকা পাবেন, দোকানদার দিচ্ছেন না। ওই টাকার বিনিময়ে ভুক্তভোগীর স্বামীকে টিভি, ফ্রিজসহ অন্যান্য আসবাব নিতে বলেন এবং সমপরিমাণ টাকা তাঁকে দেওয়ার কথা বলেন। এর পর জানান, মীর মশাররফ হোসেন হলে মোস্তাফিজের সঙ্গে তাঁর (মামুন) কিছুদিন থাকতে হবে। মামুন ভুক্তভোগীর স্বামীকে তাঁর কাপড় নিয়ে ক্যাম্পাসে আসার জন্য স্ত্রীকে বলতে বলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে ক্যাম্পাসে ডেকে আনেন। রাত ৯টার দিকে ওই নারী ক্যাম্পাসে আসেন। 

পুলিশ জানায়, ভুক্তভোগীর স্বামী, মামুন, মোস্তাফিজ ও মুরাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে আসেন। এক পর্যায়ে মুরাদ ভুক্তভোগীর স্বামীকে মীর মশাররফ হোসেন হলের এ-ব্লকের ৩১৭ নম্বর কক্ষে নিয়ে বেঁধে ফেলে ও মারধর করেন। পরে মোস্তাফিজ ও মামুন ওই নারীকে হলসংলগ্ন বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশের জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ওই নারী ও তাঁর স্বামীকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

ছাড়া পেয়ে ওই দম্পতি প্রথমে আশুলিয়া এবং পরে সাভার মডেল থানায় যান। পুলিশ কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল কাফী জানান, সাভার থানা এলাকা থেকে মোস্তাফিজকে আটক করা হয়। গতকাল সকালে মামলা হলে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পলাতক মুরাদ ও মামুনকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

ধর্ষকমুক্ত ক্যাম্পাসের দাবি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর
ধর্ষণে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। মিছিলের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনে তারা সমাবেশ করেন। প্রশাসনের ব্যর্থতার জন্য তারা উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেন। ‘ক্যাম্পাসে ধর্ষক কেন, প্রশাসন জবাব চাই’; ‘ধর্ষণমুক্ত ক্যাম্পাস চাই’; ‘ধর্ষকদের পাহারাদার, হুঁশিয়ার সাবধান’ স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা। 
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সম্মিলিতভাবে ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ নামে কমিটি করেছেন। তাদের ভাষ্য, সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। কমিটির আহ্বায়ক ও ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আনিছা পারভীন জলি বলেন, ‘আবারও ফিরে এসেছে মানিকরা। আমরাও আবার ধর্ষক ও নিপীড়কমুক্ত ক্যাম্পাস করব। আমাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাদী হয়ে মামলা করবে, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অবৈধ শিক্ষার্থীদের হল থেকে দ্রুত সরাতে হবে, প্রক্টর, প্রভোস্টের ভূমিকা স্পষ্ট করতে হবে।’ 

ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় 
গত ৯ বছরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বহিরাগত নারীকে শারীরিক হেনস্তার অন্তত ১০টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে ক্যাম্পাসে ঘুরতে এসে এক নারী লাঞ্ছিত হন। একই বছর পহেলা বৈশাখে আদিবাসী এক ছাত্রীকে যৌন হেনস্তা, ছিনতাই ও মারধরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কার করে কর্তৃপক্ষ। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ছিলেন। এ ছাড়া ৬ মার্চ দোল উৎসবে এক ছাত্রীর গায়ে রং দেওয়ার দায়ে ছাত্রলীগের এক নেতাকে তিন মাসের জন্য ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। 

২০১৬ সালের জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত এক নারীকে যৌন হয়রানিতে বাধা দেওয়ায় এক শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় তিন ছাত্রলীগ কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে লাঞ্ছিত ও এক সংবাদকর্মীকে মারধরের অভিযোগে ছাত্রলীগের পাঁচজনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। একই বছরের নভেম্বরে এক শিক্ষার্থী ও তাঁর বান্ধবীকে ধর্ষণের হুমকি দিয়ে কানের দুল ছিনিয়ে নেওয়ায় ছাত্রলীগের তিনজনকে আজীবন এবং দু’জনকে দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। একই বছরের জুনে বহিরাগত এক ব্যক্তি ও তাঁর বান্ধবীর মোবাইল ফোন এবং মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তিনজনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। 

প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের অপসারণ দাবিতে আন্দোলনে ২০১৯ সালের ৫ নভেম্বর হামলা করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ২০২২ সালের জুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে মারধর ও আরেক নারী শিক্ষার্থীকে শারীরিক হেনস্তার অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দুই ছাত্রলীগ কর্মীর বিরুদ্ধে। তবে এর বিচার হয়নি। গত আগস্টে ছিনতাইয়ের শিকার হন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) এক সহকারী অধ্যাপক। ওই ঘটনায় ছাত্রলীগের দুই নেতাকর্মীর জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। 

এমসি কলেজের ঘটনায় মামলা চলছে
এর আগে ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুরতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হন এক নারী। বিকেলে দক্ষিণ সুরমার এক যুবক তাঁর নববিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুরতে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যার পর কলেজের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান করছিলেন তারা। এ সময় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী তাদের ঘিরে ধরে। একপর্যায়ে তাদের জিম্মি করে গাড়িতে তুলে কলেজের ছাত্রাবাসের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। ছাত্রাবাসের একটি কক্ষে ওই নারীকে ধর্ষণ করে তারা।

গ্রেপ্তারের পর তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ওই বছরের ডিসেম্বরে ছাত্রলীগের আট নেতাকর্মীকে অভিযুক্ত করে মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। এ মামলায় বিচার চলছে। আসামি সবাই কারাগারে।


 

আরও পড়ুন

×