ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

মধ্যরাতে হঠাৎ প্লাবন

বিস্তীর্ণ এলাকা ফসলের ক্ষতি বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি

বিস্তীর্ণ এলাকা ফসলের ক্ষতি বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি

‘কৃত্রিম লেকের’ বাঁধ কেটে দিলে শনিবার মধ্যরাতে প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ এলাকা। ছবিটি পানি নেমে যাওয়ার পর সাতকানিয়ার মিরজাখিল এলাকার সমকাল

 লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০০:৩২

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় জমি দখলমুক্ত করতে ‘কৃত্রিম লেকের’ বাঁধ কেটে দিয়েছে বন বিভাগ। পূর্বঘোষণা ছাড়া বাঁধ কেটে দিলে শনিবার মধ্যরাতে পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত, প্রায় ২০ একর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত ও অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। এতে শীতে খোলা আকাশের নিচে কয়েকশ মানুষ রাত কাটাতে বাধ্য হন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধ কাটার আগে ন্যূনতম সতর্কতা জারি করা হয়নি। এমনকি আশপাশের বাসিন্দাদেরও কিছু জানায়নি বন বিভাগ। তাদের এ আচরণকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আখ্যা দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

২০২১ সালে স্থানীয় প্রভাবশালীরা সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার সোনাকানিয়া ও বড়হাতিয়া পাহাড়ি বনের প্রায় আড়াই হাজার একরে ২০০ ফুট লম্বা, ২০ ফুট চওড়া ও ১০০ ফুট উঁচু বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম লেক বানিয়ে মাছ চাষ শুরু করে। বন বিভাগের দাবি, অভিযোগের সত্যতা পেয়ে জমি দখলমুক্ত করতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করলেও চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দীন নদভীর কারণে সে প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

তবে হঠাৎ করে শনিবার বন বিভাগের চট্টগ্রাম সদর ও দক্ষিণের দুই সহকারী বন সংরক্ষক মারুফ হোসেন এবং দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে অন্তত ৬০ কর্মী বাঁধটি অপসারণ করেন। মারুফ হোসেন ও দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নির্দেশে তারা বাঁধ অপসারণ করেছেন। দখলদারদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।

রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাঁধ কাটা শেষ হয়। দূর পাহাড় থেকে পানি গড়িয়ে নিন্মাঞ্চলে যেতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে। ফলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে দুই ইউনিয়নের লোকালয়ে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। সাতকানিয়ার সোনাকানিয়ার মির্জাখীল বাংলাবাজার পুরোটা তলিয়ে যায়। দোকানে পানি ঢুকে মালপত্র নষ্ট হয়। ভ্রাম্যমাণ দোকানের পণ্যসামগ্রী ভেসে যায়। এর পর সাতকানিয়ার সাইরতলী, তাঁতীপাড়া, কুতুবপাড়া ও মঙ্গলচাঁদ পাড়া তিন থেকে পাঁছ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। সাইরতলী পাড়ার ইউসুফ আলী, খুলু মিয়া, আহমদ মিয়া এবং ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ওয়াহাব মিয়া, শফিকুল ইসলামেরসহ অর্ধশতাধিক কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়। সোনাকানিয়া খালের একাধিক জায়গায় পাড় ভেঙে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। পানির ব্যাপকতায় শুকনো মৌসুমে ডলু খালও টইটুম্বুর হয়ে পড়ে।
আলু, মরিচ, শসাসহ শীতকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। গবাদি পশু নিয়ে অনেকেই শুকনো স্থানে আশ্রয় নেন। কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হন।

সোনাকানিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা নূরুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো ঘোষণা নেই। হঠাৎ করে বন বিভাগের লোকজন লেকের বাঁধ কেটে দিল।’ সোনাকানিয়া ইউপি সদস্য মো. মহিউদ্দীন, আইয়ুব জমিদার ও সৈয়দ হোসেন জানান, বাঁধ কেটে দেওয়ায় তাদের এলাকার দেড় কোটি টাকার দুটি স্লুইসগেট ভেঙে গেছে। অসংখ্য কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। প্রায় ২০ একর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার বেশি বলে জানান ইউপি চেয়ারম্যান জসিম উদ্দীন।

ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতির জন্য বন বিভাগকে দুষছে উপজেলা প্রশাসন। লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইনামুল হাসান বলেছেন, ‘বন বিভাগ তিন বছর ধরে কিছুই করল না। এক দিনের মধ্যেই অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ কেঁটে দিল। আমি তাদের অনুরোধ করে বলেছি– তিন দিন সময় নেন; সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজটি করেন। তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে বহু মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে।’ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন বলে জানান সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন বিশ্বাস।

 

আরও পড়ুন

×