ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থীরা সোচ্চার ছিলেন শুরু থেকে

রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থীরা সোচ্চার ছিলেন শুরু থেকে

.

 হাসানউজ্জামান, ফরিদপুর

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:৫৬

বিশ শতকে উপমহাদেশের সব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ফরিদপুরের মানুষের ভূমিকা ছিল প্রত্যক্ষ। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনেও ঢাকার মতো প্রতিবাদমুখর ছিল ফরিদপুরের পথঘাট। শহরের রাজেন্দ্র কলেজ হয়ে উঠেছিল আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে শুরু থেকে সোচ্চার ছিলেন কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা মিছিল ও পথসভা করতে থাকেন। 
প্রবীণ সমাজসেবক ও শিক্ষাবিদ এম এ সামাদ বলেন, ‘রাজেন্দ্র কলেজে আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্রনেতা সৈয়দ মাহবুব আলী; সঙ্গে ছিলেন মহীউদ্দিন আহমেদ, আবদুল মতিন, মোশাররফ আলী, আবদুল বারী, আবদুল হালিম, আদিল উদ্দিন হাওলাদার, লিয়াকত আলী ও মোল্লা জালাল উদ্দিন।’

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফরিদপুর শহরে ভাষাশহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ হয়েছিল আন্দোলনকারীদের উদ্যোগেই। অম্বিকা ময়দানে নির্মিত ওই শহীদ মিনারের নকশা আঁকেন স্থানীয় শিল্পী আবদুস শুক্কুর মিয়া। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে ব্যবহারিক ভাষা করার দাবি নাকচ হওয়ার পর ঢাকায় যে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু হয়, তার ঢেউ এসে পড়ে ফরিদপুর শহরেও। এ সময় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা ফরিদপুরের বিভিন্ন মহকুমা ও থানায় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। বৃহত্তর ফরিদপুরে ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে দেন। এর পর ফরিদপুরে ভাষা আন্দোলনের গতিপথে বড় পরিবর্তন আসে। 

বিভিন্ন নিবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫২ সালে ফরিদপুরে ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে আসেন ইমামউদ্দিন আহমেদ, মনোয়ার হোসেন, লিয়াকত হোসেন, রেজাউল করিম, সিদ্দিকুর রহমান, ফজলুর রহমান সিদ্দিকী, মোশারফ হোসেন, এস এম নুরুদ্দীন, আবুল হোসেন, রওশন জামান খান, মোজাহার উদ্দিন মোল্লা প্রমুখ। রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্রীদের মধ্যে অংশ নেন ফজিলাতুন্নেসা, গুলফাম সাহানা বানু ও রুশেমা ইমাম। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মিছিলে গুলির প্রতিবাদে ফরিদপুরেও বিক্ষোভ হয়। মুসলিম লীগ নেতা খান বাহাদুর মুহাম্মদ ইসমাইল, আলাউদ্দিন খান, আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট আদেলউদ্দীন আহমেদ, আবদুর রশিদ সরকার, আবদুর রহমান বকাউল প্রমুখ খালি পায়ে ওই মিছিল করেন। ফরিদপুরের বেশ কয়েকজন তখন কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। তারা হলেন– তৎকালীন সৈনিক পত্রিকার সম্পাদক আবদুল গফুর, মেডিকেল কলেজের ছাত্র মোহাম্মদ জাহেদ, ননী গোপাল সাহা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র এ কে এম শামসুল বারী (মিয়া মোহন) ও সুফিয়া আহমেদ।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে ছাত্র নিহতের খবর ফরিদপুরে পৌঁছামাত্র বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা রাস্তায় নেমে পড়েন। কোতোয়ালি থানার সামনে ছাত্রদের মিছিলে হামলা চালায় পুলিশ, কয়েকজনকে আটকও করে। লাঠিচার্জে আহত হন ছাত্রলীগের জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক রওশন জামান খান। পরদিন ফরিদপুরে প্রথমবারের মতো পূর্ণ দিবস হরতাল পালিত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ফরিদপুর যেন মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। 

‘মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর’ গ্রন্থে সাংবাদিক আবু সাঈদ খান লিখেছেন ‘শেখ মুজিবুর রহমান তখন ফরিদপুরের কারাগারে বন্দি। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে তাঁকে ফরিদপুর কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। তিনি অনশনে অসুস্থ অবস্থায় ২৬ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘ফরিদপুরে ভাষা আন্দোলনে তখন যারা সক্রিয় ছিলেন, তাদের মধ্যে বোয়ালমারীতে আবদুল গফুর মিয়া, কামারখালীতে শামসুল হক খান, শফিকুর রহমান, ভাঙ্গার আবদুল হাই কুটি মিয়া, চরভদ্রাসনের আবদুস সাত্তার খান, সদরপুরের আবদুল হামিদ চৌধুরী এবং আলফাডাঙ্গার হাবিবুর রহমান সরদার ও  আবদুল মালেক মাস্টারের নাম উল্লেখযোগ্য। বোয়ালমারী ও কামারখালীতে প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেন কমিউনিস্ট নেতা কমরেড শ্যামেন ভট্টাচার্য, কংগ্রেস নেতা কফিলউদ্দিন মৌলভী, কফিলউদ্দিন ভলান্টিয়ার ও সুধীর কুমার ভট্টাচার্য। ওই আন্দোলনে তৎকালীন নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টি ও কংগ্রেসের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।’

আরও পড়ুন

×