ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল

ভুয়া বিলকাণ্ডে জড়িত তত্ত্বাবধায়ক নিজেই

ভুয়া বিলকাণ্ডে জড়িত তত্ত্বাবধায়ক নিজেই

.

 আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:৫৮

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের নামে ভুয়া বিল জমা দিয়ে সোয়া ৫ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের চেষ্টায় হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি, হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ ফোরকানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন পেলেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবে দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয়।
দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ডা. সেখ ফজলে রাব্বি ও মোহাম্মদ ফোরকানকে দিয়ে ঠিকাদার মুন্সি ফররুখ হোসাইন ওরফে মুন্সি ফারুক, তাঁর ভাই মুন্সি সাজ্জাদ হোসেন, তাদের অফিস স্টাফ মুকিত মণ্ডল ভুয়া বিল জমা দিয়ে ওই অর্থ হাতানোর চেষ্টা করেন। জালিয়াতির এ ঘটনায় ডা. সেখ ফজলে রাব্বি জড়িত থাকারও প্রমাণ পেয়েছে দুদক, যদিও তিনিই প্রথম এ ব্যাপারে দুদকে অভিযোগটি দেন।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আটটি নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটের (আইসিইউ) শয্যা, আইসিইউ ভেন্টিলেটর ও কার্ডিয়াক পেশেন্ট মনিটরসহ ১৫ কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল। ঠিকাদারের সরবরাহ করা যন্ত্রপাতি মানসম্মত না হওয়ায় সেগুলো গ্রহণ করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। যন্ত্রপাতিগুলো ঠিকাদার দীর্ঘদিন হাসপাতালের গোডাউনে ফেলে রাখেন। ২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরু হলে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালকে ১০০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড ঘোষণা করে সরকার। তখন আইসিইউ সংকটের কারণে গোডাউনে থাকা যন্ত্রপাতিগুলো জরুরি ভিত্তিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে ব্যবহার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এই সুযোগে এসব যন্ত্রপাতির দাম বাবদ বকেয়া ৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা দাবি করেন ঠিকাদার। ওই বিলের অনুকূলে অর্থ বরাদ্দ দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তবে ব্যয় মঞ্জুরিপত্র প্রদান করেনি। ২০২২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকার বিল পরিশোধের জন্য ব্যয় মঞ্জুরিপত্র চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন সাবেক সিভিল সার্জন ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। মঞ্জুরিপত্র না পেলেও ২০২১-২২ অর্থবছরের মধ্যেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধে উদ্যোগী হয় জেনারেল হাসপাতাল। ২০২২ সালের ২৮ জুন বিলটি চট্টগ্রাম বিভাগীয় হিসাবরক্ষণ অফিসে উপস্থাপন করা হয়। বিলের সঙ্গে যুক্ত করা হয় একটি ভুয়া ব্যয় মঞ্জুরিপত্র। কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ে বিলটি বাতিল হওয়ার পর ৩০ জুন দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ জালিয়াতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. এনামুল হক অভিযোগটি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি, ঠিকাদার মুন্সি ফররুখ হোসাইন, মুন্সি সাজ্জাদ হোসেন, মুকিত মণ্ডল, হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ ফোরকান যোগসাজশ করে ৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করেছেন, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করা হয়েছে বলে সমকালকে জানান দুদক চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক নাজমুচ্ছাদাত। তিনি বলেন, ‘অনুমোদন পেলেই মামলাটি দায়ের হবে।’ 
দুদকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঠিকাদার মুন্সি ফারুকের ভাই মুন্সি সাজ্জাদ হোসেন তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ মোবাইল ফোন থেকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সুশীল কুমার পালের স্বাক্ষর জাল করে একটি ভুয়া ব্যয় মঞ্জুরিপত্র হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ ফোরকানকে পাঠান। ফোরকান সেটি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বিকে দেন। ২৮ জুন আহমেদ এন্টারপ্রাইজের অফিস সহকারী মুকিত মণ্ডল জেনারেল হাসপাতালে আসেন। পরে তারা পাঁচজন মিলে ভুয়া ব্যয় মঞ্জুরিপত্রের ভিত্তিতে ডা. সেখ ফজলে রাব্বির একক স্বাক্ষরে ৫ কোটি ৩৭ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিল প্রস্তুত করেন। বিলটি পাস করার জন্য একই দিন বিভাগীয় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার অফিসে পাঠানো হয়। কিন্তু যাচাই-বাছাই করে সেটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় সেখানে না যাওয়ায় বিভাগীয় হিসাবরক্ষণ অফিস ভুয়া হিসেবে বিলটি বাতিল করে। 
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ভুয়া মঞ্জুরিপত্রে যে স্মারক ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি আসলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আউটসোর্সিং খাতে নিয়োজিত জনবলের বেতন-ভাতাদি পরিশোধের জন্য বরাদ্দ আদেশের স্মারক। 
এ বিষয়ে সমকালকে ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘বিল জালিয়াতির বিষয়ে দুদকে একটি অভিযোগ দিয়েছিলাম। বিষয়টি দুদক অনুসন্ধান করছে। মামলার সুপারিশ করা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।’ আর হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, ‘ঘটনাটি ২০২২ সালের, ওই অর্থবছরে সরকারি বিল ছাড় করার শেষ দিনের। দুপুরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মুন্সি সাজ্জাদ আমার হোয়াটসঅ্যাপে ব্যয় মঞ্জুরিপত্রের কপিটি পাঠান। সেটি আসল না নকল তা যাচাই করা তখন সম্ভব ছিল না। তাৎক্ষণিক সেটি তত্ত্বাবধায়ক স্যারের হোয়াটসঅ্যাপে দিই। হিসাবরক্ষণ অফিসে উপস্থাপিত ওই বিলে আমার স্বাক্ষর ছিল না, তত্ত্বাবধায়ক স্যার একাই স্বাক্ষর করেন। বিলটি ভুয়া প্রমাণ হওয়ার পর স্যার আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন।’

আরও পড়ুন

×