ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

আন্দোলন সংগ্রামের নায়ক ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

আন্দোলন সংগ্রামের নায়ক  ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

.

 কামাল উদ্দিন, কুমিল্লা

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:০০

ভাষা আন্দোলনে কুমিল্লার জায়গাটি বিশেষ। কারণ, ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন পাকিস্তান গণপরিষদে যিনি বাংলাকে সরকারি ভাষা করার দাবি তোলেন, সেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন কুমিল্লার বাসিন্দা। তাঁর ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হলে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে উত্তাল হয় বাংলার রাজপথ। কুমিল্লা শহরেও পালন হয় সর্বাত্মক হরতাল। নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বিক্ষোভ মিছিল মিলিত হয় টাউনহল মাঠের সমাবেশে। রাজনীতিক, সমাজকর্মী ও ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন সেই আন্দোলনের অন্যতম নায়ক। নগরীর ঝাউতলায় তাঁর বাসা। 
কুমিল্লার ভাষাসংগ্রামী আবদুল অদুদ চৌধুরী তাঁর ‘বীজাঙ্কুর’ বইয়ে লিখেছেন, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৮ সালের মার্চের শুরুর দিকে কুমিল্লায় দুটি প্রতিবাদ সভা হয়। প্রথমটি হয় ভিক্টোরিয়া কলেজে ও দ্বিতীয়টি টাউন হল ময়দানে। পরে ৫ মার্চ কলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হয় সেই খবর। ১৯৫০ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কুমিল্লায় এসে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দিলে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্রসমাজ। ৪ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লায় ছাত্রসমাজের ডাকে ধর্মঘট হয়। ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুর রহমান খানকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে কলেজেও একটি কমিটি গঠন হয়।
কুমিল্লার লেখক ও গবেষক অ্যাডভোকেট গোলাম ফারুক বলেন, ‘গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হয়েই কুমিল্লা তথা দেশের ছাত্র-শিক্ষক-জনতা ভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের বাংলার অধ্যাপক ভাষাসংগ্রামী অজিত কুমার গুহ ও কুমিল্লা পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান অতীন্দ্র মোহন রায় ঢাকা থেকে আন্দোলনের নানা তথ্য পাঠিয়ে কুমিল্লার আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।’
‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস: ঘটনা প্রবাহ ও প্রেক্ষিত বিশ্লেষণ’ গ্রন্থে এম এ বার্ণিক লিখেছেন, ভিক্টোরিয়া কলেজে ভাষার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন জিয়াউল হক, আলী আক্কাস, এ কে এম জামাল উদ্দিন চানু, আনোয়ার উল্লাহ, আমীরুল ইসলাম, মো. শাহজাহান, আমীরুল ইসলাম মজুমদার, বদরুল হুদা চৌধুরী, ওয়াজিউল্লাহ, আবদুল হক প্রমুখ। স্কুল পর্যায়ের আন্দোলনে নেতৃত্বে ছিলেন কুমিল্লা হাই স্কুলের ছাত্র এ টি এম মেহেদী। ক্রমে সেই আন্দোলন কুমিল্লা শহর থেকে থানা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। তৃণমূলে আন্দোলন করেন লাকসামের ভাষাসংগ্রামী আবদুল জলিল ও সদর দক্ষিণ উপজেলার আলী তাহের মজুমদার। 
১৯৫৩ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রাঙ্গণে রাতের আঁধারে অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করেন শিক্ষার্থীরা। ১৯৫৪ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত কুমিল্লার লোকজন ওই শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ড. আবু জাফর খান বলেন, ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় নিরাপত্তার স্বার্থে কলেজ কর্তৃপক্ষ শহীদ মিনারটি বিজ্ঞান ভবনের সামনে পুকুরে ডুবিয়ে রাখে। পরে ১৯৭২ সালে সেটি সংস্কার করে কলেজের প্রধান ফটকের সামনে পুনঃস্থাপন করা হয়।’ 
এদিকে, ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে নগরীর ঝাউতলার বাসা থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। কুমিল্লা সেনানিবাসে নিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়। শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক এমপি আরমা দত্ত তখন পড়তেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সমকালকে তিনি বলেন, ‘দেরিতে হলেও কুমিল্লা নগরীতে দাদুর নামে ভাষাচত্বর, ম্যুরাল ও স্টেডিয়াম হয়েছে। দুটি তথ্যচিত্র বানিয়েছি নিজেই। ঝাউতলার বাসাটি এখন সংগ্রহশালা করতে চাই।’   

আরও পড়ুন

×