ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

বাঘসহ প্রাণী বাড়ার সংখ্যা নগণ্য, হুমকি অসংখ্য

বাঘসহ প্রাণী বাড়ার সংখ্যা নগণ্য, হুমকি অসংখ্য

ফাইল ছবি

মামুন রেজা, খুলনা

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:০২ | আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১২:০৫

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে সাম্প্রতিক সময়ে বাঘসহ কয়েক প্রজাতির বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কিছু বেড়েছে বলে দাবি করেছে বন বিভাগ। আবার কয়েক প্রজাতির বন্যপ্রাণী কমেছেও। এসব নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতপার্থক্য থাকলেও, একটি বিষয়ে সবাই একমত যে, ক্রমেই সুন্দরবনের স্থলজ ও জলজ অধিকাংশ প্রাণীর ওপর হুমকি বাড়ছে। প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও সংখ্যা বৃদ্ধি। এমন পরিস্থিতিতে আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে সুন্দরবন দিবস। 

বন বিভাগ সূত্র বলছে, বাংলাদেশ অংশের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনে ২০১৮ সালের শুমারি অনুযায়ী ২৮৯ প্রজাতির স্থলজ ও ২১৯ প্রজাতির জলজ প্রাণী রয়েছে। সে সময় বাঘ ছিল ১১৪টি। গত বছর ১ জানুয়ারি আবারও বাঘশুমারি শুরু হয়, যা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এবার শুমারিতে বাঘের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ২০২৩ সালের শুমারি অনুযায়ী বনে চিত্রা হরিণ, বন্য শূকর ও বানরের সংখ্যা বেড়েছে। বনে ২০০৪ সালে চিত্রা হরিণ ছিল ৮৩ হাজার, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টিতে। বন্য শূকর ২০০৪ সালে ছিল ২৮ হাজার, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৫১৫টিতে। ২০০৪ সালে বানর ছিল ৫১ হাজার, ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৪৪৪টিতে। এ ছাড়া বর্তমানে বনে গুইসাপ রয়েছে ২৫ হাজার ১২৪টি ও শজারু ১২ হাজার ২৪১টি। ২০২৩ সালের আগে কখনও এ দুটি প্রাণীর শুমারি হয়নি। তবে আশির দশকে মায়া হরিণ ছিল ২ হাজার ২৬৫টি, ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৮৭টিতে।

১৯৯৫ সালে বনের নদীতে কুমির ছিল ১৫০ থেকে ২০০টি, ২০১৬ সালের জরিপে কুমিরের সংখ্যা দেখানো হয় ১৫০ থেকে ২০৫টি। তবে কমেছে দুই প্রজাতির ডলফিন। ২০০৬ সালে বনের নদীতে ছিল ৪৫১টি ইরাবতী ডলফিন ও ২২৫টি শুশুক। ২০১৯ সালে কমে দাঁড়ায় ইরাবতী ডলফিন ১১৩টি ও শুশুক ১১৮টি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতেগোনা কয়েকটি প্রজাতির বন্যপ্রাণীর সংখ্যা বাড়লেও কমেনি তাদের প্রতি হুমকি। আবার সব বন্যপ্রাণীর শুমারিও হয়নি। বাঘ ও হরিণ শিকার, লোকালয়ে আসা বাঘ পিটিয়ে হত্যা, আগুন, বনজীবী ও পর্যটকদের অবাধ চলাচল, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততা বৃদ্ধি হুমকিতে ফেলছে সুন্দরবনের প্রাণীদের। এ ছাড়া বনের নদীগুলোতে শিল্পকারখানার দূষণ, বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং বনের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলের কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তারা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, ‘মাঝে মাঝেই হরিণ শিকারের খবর পাওয়া যায়। বনের মধ্যে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও পর্যটকদের অবাধ যাতায়াত বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের জন্য বড় হুমকি। শিল্পকারখানা নিঃসৃত রাসায়নিকের কারণে নদীর পানিতে দূষণের মাত্রা বাড়ায় বন্যপ্রাণীর ওপর প্রভাব পড়ছে। এ ছাড়া প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি তো আছেই। এসব হুমকি নিরসন করা গেলে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা আরও বাড়বে।’

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘বনের পার্শ্ববর্তী এলাকায় গ্যাস, জ্বালানি তেল, সিমেন্ট ফ্যাক্টরিসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানার তরল বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। জোয়ার-ভাটায় এই বর্জ্য বনে ছড়িয়ে পড়ায় মাটিতে রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণ বাড়ছে। যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাটিতে চলাফেরা করা বন্যপ্রাণী। এ ছাড়া বনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জাহাজ চলাচল করছে। এই জাহাজগুলোর বর্জ্য ও তেল বনের পানি-মাটিতে দূষণ বাড়াচ্ছে। জাহাজের আলো ও শব্দ প্রভাব ফেলছে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাপনে। কিছু জেলে সুন্দরবনের নদী, খাল, খাঁড়িগুলোতে বিষ দিয়ে মাছ ধরছে। এই বিষাক্ত পানি বন্যপ্রাণী পান করলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জোয়ারের সময় নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে। ফলে বনভূমি ডুবে যাওয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় কমেছে বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র।’ 

সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, ‘বন্যপ্রাণীর হুমকিগুলো আগের তুলনায় আরও বেড়েছে। লোকালয়ে চলে আসা বাঘ ও অজগর সাপ মানুষ পিটিয়ে মারছে। বনের গাছপালা চুরি করে কেটে বন্যপ্রাণীর বসতি হুমকির মুখে ফেলছে কিছু মানুষ। এসব কারণে বিরূপ প্রভাব পড়ছে বন্যপ্রাণীর ওপর।’ 

এ ব্যাপারে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো জানান, সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকা ২৩ শতাংশ থেকে ৫২ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। বন বিভাগের নজরদারি ও টহল বাড়নো হয়েছে। পাশাপাশি কোস্টগার্ড ও র‍্যাব সমন্বিতভাবে তৎপর আছে। ফলে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী আগের চেয়ে বেশি সংরক্ষিত আছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকেও সচেতন করা হচ্ছে।

এদিকে আজ সুন্দরবন দিবস উপলক্ষে বেলা সাড়ে ১১টায় সুন্দরবন একাডেমিসহ চারটি সংগঠন খুলনা প্রেস ক্লাস মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। 

আরও পড়ুন

×