ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

৯৮ অবৈধ ইটভাটায় পুড়ছে গাছ

৯৮ অবৈধ ইটভাটায় পুড়ছে গাছ

জামালপুর পৌর এলাকার জঙ্গলপাড়ায় চলছে অবৈধ একটি ইটভাটা সমকাল

আনোয়ার হোসেন মিন্টু, জামালপুর 

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০০:৩৪

লাইসেন্সবিহীন ভাটায় ইট পোড়ানো আইনিভাবে নিষিদ্ধ। নির্বিচারে গাছ নিধনও দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে আইন অমান্য করেই জামালপুরের ৯৮টি অবৈধ ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে ইট। এসব ভাটায় নির্বিচারে পুড়ছে গাছ। অবৈধ ভাটাগুলো কীভাবে চলছে প্রশাসনের কাছে তার সদুত্তর নেই। তবে তাদের বক্তব্য হচ্ছে, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।
জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ব্যবসা বাণিজ্য শাখা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জামালপুর সদর, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী ও বকশীগঞ্জ উপজেলায় অন্তত ১১০টি ভাটায় ইট পোড়ানো হচ্ছে। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ১২টির। বাকি ভাটাগুলো কোন আইনে চলছে, তার সদুত্তর নেই প্রশাসন কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তার কাছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ভাটা নির্মাণের আগে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই তিন মাসের বেশি সময় ধরে অবৈধভাবে ইট তৈরি ও বিক্রি করে আসছে ভাটা মালিকরা।
অভিযোগ রয়েছে, জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সংস্থাকে ম্যানেজ করে বীরদর্পে ভাটা পরিচালনা করছেন প্রভাবশালীরা। যে কারণে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে আগ্রহ নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
জামালপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের দাবি, সম্প্রতি জামালপুর পৌরসভার জঙ্গলপাড়া বোর্ডঘর এলাকার মেসার্স স্টার-১ ব্রিকস, মেসার্স কিং ব্রিকস, শীতলকুর্শা এলাকার মেসার্স জীবন ব্রিকস ও দিগপাইত ছোনটিয়া এলাকার মেসার্স নসিব ঢাকা ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিন্তু সরেজমিন দেখা গেছে এক দিনের জন্যও ওইসব ভাটার কার্যক্রম থেমে থাকেনি।
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, জামালপুর সদর উপজেলায় ভাটা রয়েছে ৩০টি। লাইসেন্স আছে চারটির। সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. বরকতুল্লাহ বলেন, লাইসেন্সবিহীন অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলবে।
ইসলামপুর উপজেলায় ভাটা রয়েছে ছয়টি। লাইসেন্স আছে একটির। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এখনও অবৈধ কোনো ভাটায় অভিযান চালানো হয়নি। তবে শিগগিরই অভিযানে নামবেন তারা। 
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় ভাটা আছে সাতটি। লাইসেন্স নেই একটিরও। নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ জাহিদ হাসান প্রিন্সের ভাষ্য, তিনি নতুন এসেছেন। অবৈধ ভাটাগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সে ব্যাপারে কিছুই জানা নেই তার।
মাদারগঞ্জ ও মেলান্দহ উপজেলায় ভাটা আছে ৩৮টি। তার মধ্যে লাইসেন্স আছে মাত্র চারটির। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাইযুল ওয়াছীমা নাহাত এই দুই উপজেলার দায়িত্বে আছেন। তারও একই কথা, এখনও কোনো অবৈধ ভাটায় অভিযানে যাননি তারা। তবে শিগগিরই অভিযান শুরু করবেন বলে দাবি তাঁর।
বকশীগঞ্জে সাতটি ভাটার মধ্যে কোনোটারই লাইসেন্স নেই। এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অহনা জিন্নাত মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকার অজুহাতে কথা শেষ না হতেই লাইন কেটে দেন।
সরিষাবাড়ীতে লাইসেন্সবিহীন ১৯টি ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে ইট। লাইসেন্স রয়েছে তিনটির। ইউএনও শারমিন আক্তার বলেন, অবৈধ ভাটায় ইট পোড়ানোর বিষয়টি তাঁর জানা রয়েছে। অভিযানের ব্যাপারে ওপরের নির্দেশনাও রয়েছে, জরুরি ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন তিনি।
কথা হয় পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের জামালপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলীর সঙ্গে। তাঁর ভাষ্য, লাইসেন্সবিহীন ভাটায় ইট পোড়ানো আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। নির্বিচারে গাছ নিধনও দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ প্রচলিত আইন উপেক্ষা করে আবাসিক এলাকায় অসংখ্য অবৈধ ভাটা চলছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সুকুমার সাহা জানান, সম্প্রতি চারটি অবৈধ ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে ২৩ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন তারা। তাঁর লোকবল সীমিত তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অভিযান পরিচালনা করা যায় না। 
জেলা প্রশাসক শফিউর রহমান বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর সম্প্রতি অবৈধ ভাটায় অভিযান পরিচালনা করেছে। জেলা প্রশাসনের করণীয় সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘সব ভাটার মালিক, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে শিগগিরই সভা করবেন। সভায় সমস্যা শোনা হবে। তবে আবাসিক এলাকায় স্থাপিত ও লাইসেন্সবিহীন অবৈধ ভাটার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন

×