ঢাকা বুধবার, ২২ মে ২০২৪

ঠিকাদারের ইটপাথরে মাঠের সর্বনাশ

হরিণাকুণ্ডু

ঠিকাদারের ইটপাথরে মাঠের সর্বনাশ

কিশোর-তরুণদের খেলার মাঠে দুই বছর ধরে রাখা হয়েছে নির্মাণসামগ্রী। সোমবার হরিণাকুণ্ডুর রামনগর মাঠের চিত্র। ছবি: সমকাল

এম সাইফুজ্জামান তাজু, হরিণাকুণ্ডু (ঝিনাইদহ)

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৪ | ০৪:৩৭

এক সময় যে মাঠের বিকেল ছিল কিশোর-তরুণদের পদচারণায় মুখর, সেই মাঠের কোথাও স্তূপ করে রাখা হয়েছে ইট। কোথাও সারি সারি ড্রাম। আবার পাথরও ফেলে রাখা হয়েছে অনেকটা জায়গাজুড়ে। এসব নির্মাণসামগ্রীর পাশাপাশি কংক্রিট মিকশ্চারের বিশাল বিশাল মেশিনও রাখা সেই মাঠে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে এমন চিত্র হরিণাকুণ্ডুর তাহেরহুদা রামনগর গ্রামের খেলার মাঠটির।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, দুটি সড়কের নির্মাণকাজের জন্য ওই মাঠটি ব্যবহার করায় খেলাধুলা করতে পারছে না স্থানীয় কিশোর-তরুণরা। ফলে বিপথগামী হচ্ছে তারা। ঝুঁকে পড়ছে মাদকসহ নানা অপরাধে। এতে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে অভিভাবকদের মনে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ওই মাঠটি দখলমুক্ত করার দাবি তাদের।

সোমবার সরেজমিন দেখা যায়, দৈর্ঘ্যে ১০৫-১১০ মিটার ও ৮০-৮৫ মিটার চওড়া মাঠজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে নির্মাণসামগ্রী। কোথাও কোথাও গর্ত করে তৈরি হয়েছে বিটুমিন পোড়ানোর চুলা। এ কারণে সৃষ্ট কালো ধোঁয়ায় বিষাক্ত হচ্ছে পরিবেশ। মাঠের চারদিকে অসংখ্য তাঁবুতে করা হয়েছে শ্রমিকদের অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা। মাঠটি দেখলে মনেই হবে না, বছর দু-এক আগেও এখানে খেলাধুলায় মেতে উঠত কিশোর-তরুণরা। মনে হবে, পরিত্যক্ত কোনো জায়গা।

এলাকাবাসী জানান, মাঠটির আধাকিলোমিটার থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে কাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চারুমন নেছা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, হাজি আরশাদ আলী দাখিল মাদ্রাসা, ভবানীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়। মাঠটি দুটি ইউনিয়নের মধ্যে বেশ বড় হওয়ায় এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা খেলতে আসত। বছরের পর বছর ধরে চলে আসছিল এ ধারা। কিন্তু মাঠটি দুই ঠিকাদারি কোম্পানির দখলে থাকায় খেলাধুলা বন্ধ।

২০২২ সালের জানুয়ারিতে হরিণাকুণ্ডু-তৈলটুপি সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ইপিআইসি-কাপতাক্ষিজেভি নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শুরু করে কাজ। তারা মাঠ দখল করে নির্মাণসামগ্রী রাখা শুরু করে। দুই মাস আগে ওই সড়কের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এখনও সরানো হয়নি সামগ্রী। এরই মধ্যে বছরখানেক আগে এক কিলোমিটার দূরের হরিশপুর সড়কের কার্পেটিং শুরু করে আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মধুমতি কনস্ট্রাকশন। তাদের নির্মাণসামগ্রীও রামনগর মাঠে।

রামনগরের শিলু আহাম্মেদ পড়েন ঝিনাইদহ সরকারি কেশবচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ে। তারা এ মাঠেই খেলাধুলা শিখেছেন। নিয়মিত এখানে খেলতেন। 

শিলু আহাম্মেদ বলেন, পাশের হরিশপুর, গাজিপুর, রামনগর, সাতব্রিজ, তাহেরহুদাসহ কয়েকটি গ্রামের যুবকও আগে নিয়মিত এই মাঠে আসতেন। প্রতিবছর আয়োজন করা হতো ফুটবল, ক্রিকেটসহ নানা খেলার টুর্নামেন্ট। কিন্তু মাঠটি বন্ধ থাকায় দুই বছর ধরে এলাকায় খেলাধুলা হয় না।

স্বাধীনতার পর এলাকাবাসীর জমিতে খেলার মাঠ গড়ে ওঠে জানিয়ে সত্তরোর্ধ্ব ফজলুর রহমান বলেন, এখানে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, দাঁড়িয়াবান্ধাসহ নানা খেলাধুলা হতো। এখানে খেলা শিখে অনেকে জেলা-উপজেলাসহ সারাদেশে সুনাম কুড়িয়েছে। স্কুল থেকে ফিরেই যুবকরা মাঠে খেলাধুলা নিয়ে মেতে থাকত। তারা বসে দেখতেন। 

তিনি বলেন, নিয়মিত মাঠে খেলাধুলা থাকায় যুবসমাজ ও শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল। এলাকায় মাদকের বালাই ছিল না। দুই বছর ধরে মাঠটি ঠিকাদারদের দখলে থাকায় ছেলেরা মাদকসহ নানা অপরাধে ঝুঁকছে। 

চারুমন নেছা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আজাহার আলী বলেন, বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এ মাঠেই ক্রীড়ানুষ্ঠানের আগে অনুশীলন করত। বড় মাঠ হওয়ায় তাহেরহুদা ও জোড়াদহ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের শিশু-কিশোর ও তরুণরা আসত। মাঠে নির্মাণসামগ্রী রাখায় তারা খেলাধুলায় পিছিয়ে পড়ছে। 

হরিণাকুণ্ডু-তৈলটুপি সড়কের কাজ দুই মাস আগে শেষ হয়েছে। এখনও নির্মাণসামগ্রী না সরানোর বিষয়ে জানতে চাইলে ইপিআইসি-কাপতাক্ষিজেভির পক্ষে নাসের আলম সিদ্দিকী উজ্জ্বল বলেন, দ্রুতই এসব মাঠ থেকে সরিয়ে নেবেন। তবে নির্ধারিত দিন জানাতে পারেননি।

মধুমতি কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী বাটুল জোয়ার্দারের ভাষ্য, ‘যখন কাজ শুরু করি, তখন ওই এলাকায় মালপত্র রাখার জায়গা ছিল না। তাই ওই মাঠে রেখেছি।’ আগামী সপ্তাহে কাজ শেষ হলেই নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে ফেলার আশ্বাস দেন তিনি।

তাহেরহুদা ইউপি চেয়ারম্যান মঞ্জুর রাশেদ বলেন, বারবার ঠিকাদারদের মালপত্র সরিয়ে নিতে বললেও শুনছেন না। দ্রুত খেলার পরিবেশ নিশ্চিতে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী রাকিব হাসানের ভাষ্য, কোথায় মালপত্র রেখে কাজ করবেন, সেটা ঠিকাদারের বিষয়; তাদের দেখার বিষয় নয়। যদি মাঠ দখল করে সামগ্রী রাখা হয়, তা উপজেলা প্রশাসন দেখবে। 

ইউএনও আক্তার হোসেন বলেন, মাঠ দখল করে নির্মাণসামগ্রী রাখা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুত সেখান থেকে এসব অপসারণে ব্যবস্থা নেবেন। 

আরও পড়ুন

×