ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

দ্রুতগতির লেনে যাত্রী নামাচ্ছে বাস

দ্রুতগতির লেনে যাত্রী নামাচ্ছে বাস

দ্রুতগতির লেন থেকে ধীরগতির লেনে আসতে উঁচু সড়ক বিভাজক পার হচ্ছেন কয়েক যাত্রী। রোববার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের শিমরাইল মোড়ে সমকাল

শাহজাহান জনি, সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৪ | ০০:০৪

বড় বোন মোসা. জাহেরা বেগমকে (৭০) নিয়ে মোসা. রাবেয়া খাতুন (৬৫) আসেন সিলেট থেকে। গতকাল রোববার দুপুরে শ্যামলী পরিবহনের বাসটি তাদের নামিয়ে দেয় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলে। ঢাকামুখী দ্রুতগতির (হাইওয়ে) লেনে নেমেই বিপাকে পড়েন এই দুই বৃদ্ধ নারী। কারণ সড়কের পাশে যাওয়ার চেষ্টা করতেই তারা দেখেন পাঁচ ফুট উঁচু সড়ক বিভাজক। আশপাশে কোথাও ফাঁকা নেই। বাধ্য হয়ে বহু কায়দা-কসরত করে পাশের ধীরগতির স্থানীয় (লোকাল) লেন পার হয়ে সড়কের পাশে যান।
সেখানেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন রাবেয়া ও জাহেরা। তারা চালক-সহকারীকে নানাভাবে বুঝিয়েছেন, বৃদ্ধ বয়সে এত উঁচু বিভাজক পার হওয়া সম্ভব নয়। তবু বাসটি লোকাল লেনে না এনে হাইওয়ে লেনে নামিয়ে চলে যায়। দুই-তিন মাস ধরে দেশের পূর্বাঞ্চলের ১৮টি জেলার যাত্রীরা এভাবে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। সঙ্গে শিশু-বৃদ্ধ থাকলে এর মাত্রা ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রায়ই পা হড়কে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন অনেকে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ব্যস্ততম শিমরাইল মোড়ে একটি পথচারী সেতু রয়েছে। মহাসড়কের দুই পাশ থেকে পথচারীরা পারাপার করেন। নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, আট লেনের মহাসড়কে ঢাকাগামী সড়ক চার লেনের। আর চার লেন চট্টগ্রামমুখী। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের দিকে দুটি করে চারটি লেন ব্যবহৃত হচ্ছে দ্রুতগামী লেন হিসেবে। অপর চার লেন লোকাল লেন। ওই লেনগুলো দিয়ে স্থানীয় ও ধীরগতির যানবাহন চলাচল করে। নিয়মানুযায়ী, দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসসহ সব ধরনের যানবাহনকে লোকাল লেনে এসে যাত্রী নামাতে হবে।
কিন্তু শিমরাইলে দেখা গেছে বিপরীত চিত্র। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, সিলেট, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুরসহ পূর্বাঞ্চলীয় ১৮টি জেলা থেকে ঢাকাগামী দূরপাল্লার বাসগুলো শিমরাইল মোড়ে যাত্রী নামিয়েই দায় সারে। উঁচু সড়ক বিভাজক পার হতে হয় তাদের। এর বিপরীতেই রয়েছে হাইওয়ে পুলিশের বক্স। যাত্রীদের অভিযোগ, পুলিশ সদস্যরা সেখানে বসে বসে তামাশা দেখেন। বাসচালক ও সহকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয় না। 
হানিফ এন্টারপ্রাইজের একটি বাসে করে রোববার শিমরাইলে নামেন আব্দুল ওহাব (৭৫)। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী মর্জিনা বেগম (৬৫), পুত্রবধূ সোনিয়া (২৮) ও নাতনি সাদিয়া (৭)। তাদের সবাইকেই দ্রুতগামী লেনে নামিয়ে দেন বাসচালকের সহকারী। 
কুমিল্লা থেকে আসা রেহেনা আক্তারের (৩০) সঙ্গে ছিল ৮ বছর বয়সী ছেলে রাকিব। সঙ্গে ছিল কিছু মালপত্র। রেহানা বলেন, ‘মালপত্র ও শিশুসন্তান নিয়ে কীভাবে এই উঁচু দেয়াল (বিভাজক) পার হব, বুঝতে পারছি না।’
তাঁর কথায় সায় দিয়ে অন্য যাত্রী ও তাদের স্বজনরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের ভাষ্য, এত উঁচু সড়ক বিভাজক স্থাপনে সওজ ও হাইওয়ে পুলিশের সমন্বয়ে করা হয়েছে কিনা, এ নিয়ে সন্দেহ আছে। যদি সমন্বয় করা হতো, তাহলে ঢাকামুখী দ্রুতগতির লেনে এভাবে যাত্রী নামিয়ে দেওয়া হতো না। বিভাজক পার হতে গিয়ে যে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, তা এককথায় অমানবিক বলেও মন্তব্য করেন তারা। 
লোকাল লেনে না গিয়ে দ্রুতগতির লেনে যাত্রী নামানোর বিষয়ে কথা হয় দূরপাল্লার বাসের চালক মো. সাহেব আলী, মো. আবুল হোসেন, মো. সাইদুল ইসলাম ও মো. আব্দুর রহমানের সঙ্গে। তাদের অভিযোগ, লোকাল লেনের যেখানে সেখানে থামিয়ে রাখা হয় নীলাচল, মনজিল, রজনীগন্ধা, সময় ও শতাব্দীসহ স্থানীয় পরিবহন কোম্পানির নানা বাস। ফলে ওই লেনে যানজট লেগেই থাকে। 
কয়েকজন চালকের অভিযোগ, হাইওয়ে পুলিশকে হাত করেই স্থানীয় পরিবহন কোম্পানির বাসস্ট্যান্ড করা হয়েছে। তারা যাত্রী উঠানো নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এসব কারণেই দূরপাল্লার চালকদের কেউ ওই লেনে ঢুকে সময় নষ্ট করতে 
চান না। বাধ্য হয়ে যাত্রীদের দ্রুতগতির লেনেই নামাতে হয়। 
শিমরাইল পদচারীর সেতুর নিচে বা কাছাকাছি এলাকায় যাত্রী নামানোকে নিয়মবিরুদ্ধ বলে মন্তব্য করেন হাইওয়ে পুলিশের শিমরাইল ক্যাম্প ইনচার্জ একেএম শরফুদ্দিন। তিনি বলেন, এই এলাকার বাসগুলোকে শিমরাইল মোড়ের ৩০০ গজ পশ্চিমে যাত্রী নামাতে হবে। কিন্তু চালক-সহকারীরা তা মানছেন না। তাড়াহুড়ো করে মোড়েই নামিয়ে দিচ্ছেন। সওজ’র উঁচু বিভাজকের কারণে যাত্রীদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। 
তাঁর দাবি, ওই এলাকায় বাস দাঁড়ালেই মামলা দিচ্ছেন। যদিও গতকাল হাইওয়ে পুলিশের কাউকে সেখানে দেখা যায়নি। দুপুরের দিকে সওজ বিভাগের পক্ষ থেকে দায়িত্ব দেওয়া আনসারের কয়েকজন সদস্যকে মহাসড়কে দেখা যায়। তবে তাদের সামনেই যত্রতত্র যাত্রী নামাচ্ছিল বাসগুলো। কোনো ব্যবস্থাই নিতে দেখা যায়নি তাদের।
নারায়ণগঞ্জ সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহানা ফেরদৌস বলেন, শিমরাইলে দ্রুতগতির লেনে কোনো বাসের যাত্রী নামানোর সুযোগ নেই। যাত্রী নামাতে হলে তাদের লোকাল বা ধীরগতির লেনে আসতে হবে। এ নিয়ম যদি না মানা হয়, তবে লেন আলাদা করে কী লাভ হলো?
দ্রুতগতির লেনে দূরপাল্লার বাস থামা বন্ধ করতে সওজ থেকে আনসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে শাহানা ফেরদৌস আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব হাইওয়ে পুলিশের। তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে যে সমস্যা হচ্ছে, তা থাকবে না। 
 

আরও পড়ুন

×