ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

পদে পদে অনিয়ম, সেবার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন

চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতাল

পদে পদে অনিয়ম, সেবার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন

ফাইল ছবি

 শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৪ | ০০:১১ | আপডেট: ১১ মার্চ ২০২৪ | ০৭:১৪

মেয়াদোত্তীর্ণ ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়েই সম্পন্ন হচ্ছে রোগীর নমুনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এমনকি ল্যাবরেটরিতে রোগীর নমুনা পরীক্ষা কিংবা রিপোর্ট তৈরির আগেই হাসপাতালের প্যাডে অগ্রিম সই করে রাখেন টেকনোলজিস্ট! কার্ডিওগ্রাফার ও মেডিকেল অফিসার ছাড়াই দিব্যি চলছে জরুরি বিভাগ। সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার ওপর ভর করেই ‘খ্যাতি’ কুড়িয়েছে চট্টগ্রামের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতাল। বিশেষ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রোগী ও স্বজনের সঙ্গে প্রতারণাও করছে প্রতিষ্ঠানটি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মকানুনকেও করছে থোরাই কেয়ার! অনিয়মই যেন হাসপাতালটির নিয়ম।

চিকিৎসাসেবার এমন নাজুক হাল শুধু এ হাসপাতালেই নয়; চট্টগ্রামের বেশির ভাগ বেসরকারি হাসপাতালে একই নৈরাজ্য, প্রতারণা চলছে। স্বাস্থ্য বিভাগের নিবন্ধন না থাকা, দৃশ্যমান স্থানে দরের তালিকা না রাখা, কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য না থাকা, ডিপ্লোমাহীন টেকনিশিয়ান দিয়ে রোগীর কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করাসহ নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি ও অনিয়ম মাথায় নিয়ে রোগীদের ২৪ ঘণ্টা সেবা দিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এভাবে অনিয়মের মাধ্যমে যার যেমন ইচ্ছা, অনেকটা তেমন নীতিতেই চিকিৎসাসেবার নামে চলছে অরাজকতা।

এ যেমন– বন্দরনগরীর আরেকটি ‘বিশ্বস্ত’ চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল সিটি হাসপাতাল। নগরীর প্রবর্তক মোড়ের এ প্রতিষ্ঠানটিও দীর্ঘদিন ধরে হাঁটছে অব্যবস্থাপনার পথ ধরে। প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়াই চলছিল রোগীদের নমুনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। নিয়ম অনুযায়ী যে সংখ্যক চিকিৎসক-সেবিকা থাকার কথা, সমপরিমাণ জনবল ছাড়াই চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছিল প্রতিষ্ঠানটি। বিস্তর অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে চোখ কপালে ওঠে খোদ স্বাস্থ্য প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাদের। পরে হাসপাতালটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অনিয়মে পিছিয়ে নেই ন্যাশনাল হাসপাতালও। প্রতিষ্ঠানটির জরুরি বিভাগে রোগীদের ইসিজি পরীক্ষা কার্যক্রম চলছে কার্ডিওগ্রাফার ছাড়া। তাদের পরিচালিত সিগমা ল্যাবে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যবহার করা হয় মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিবন্ধন না নিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল নগরীর পাঁচলাইশের সিপিআরএল ল্যাবও। এ কারণে ল্যাবের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। এ ছাড়া  অভিজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়া জেনেটিক ল্যাবে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অ্যান্ডোসকপি ও ইসিজি বিভাগের কার্যক্রম। একইভাবে নিয়মকে তোয়াক্কা না করে মেডিহেলথ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চলছে রোগীর এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি। অব্যবস্থাপনার মিছিলে আরও আছে নগরীর জামালখান এলাকার ল্যাব এক্সপার্ট, সেনসিভ (প্রাইভেট) লিমিটেড, ইনোভা হসপিটাল লিমিটেড অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

বিশিষ্টজনরা মনে করেন, বেসরকারি হাসপাতালের এমন অরাজকতা প্রতারণার শামিল। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রামের বেশির ভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। তারা নামে-বেনামে গলাকাটা ফি আদায় করলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা দিচ্ছে না। কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ চিকিৎসা দেওয়ার নামে রোগীর জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ক্ষতিকর মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক দিয়ে করবেন না। এরা টাকার জন্য অনেকের জীবনকে হুমকিতে ফেলছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনের কঠোর তদারকি না থাকার কারণেই এমন বেপরোয়া আচরণ করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এ দায় কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না।’

অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার বিষয়ে ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) লিয়াকত আলী খান  বলেন, ‘হাসপাতালে কিছু কিছু অসঙ্গতি আছে। তবে সেগুলো ঠিক করা হচ্ছে। এ জন্য আমাদের একটি টিম কাজ করছে। সম্প্রতি হাসপাতালের পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে নতুন কমিটি। তারাও সব বিষয় দেখভাল করছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রামের বেশকিছু বেসরকারি হাসপাতাল-ল্যাব পরিদর্শন করে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পেয়েছি। এ জন্য বেশ কয়েকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। করা হয়েছে জরিমানাও। কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কৈফিয়তও তলব করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।’

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী বলেন, ‘বেশকিছু বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনাসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অমান্য করার প্রমাণ পেয়েছি আমরা। বেশকিছু প্রতিষ্ঠান চলছে প্রয়োজনীয় ডাক্তার ও প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়া। কিছু প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় অসঙ্গতি দূর করতে সময় দেওয়া হয়েছে। যথাযথ নিয়ম মানতে না পারলে সেসব প্রতিষ্ঠানও শিগগির বন্ধ করে দেওয়া হবে।’

চট্টগ্রামের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. ওয়াজেদ চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্বস্ত ম্যাক্স হাসপাতালও চিকিৎসার নামে অরাজকতা করছে। সরেজমিন প্রতিষ্ঠানটির ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্যাডে রিপোর্ট তৈরি হওয়ার আগেই টেকনোলজিস্টের অগ্রিম সই দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছি। তাদের ল্যাবে মিলেছে মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক। কার্ডিওগ্রাফার ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি রোগীর ইসিজি পরীক্ষা করছে। বিষয়টি উদ্বেগের।’

আরও পড়ুন

×