ঢাকা বুধবার, ২২ মে ২০২৪

স্কুল-কলেজ কামাই করে অপরাধে কিশোররা

চট্টগ্রামে বাড়ছে অপরাধ

স্কুল-কলেজ কামাই করে অপরাধে কিশোররা

প্রতীকী ছবি

আব্দুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৪ | ০০:১১ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৪ | ০০:১১

খুন, চুরি, ছিনতাই, মাদক বিক্রিসহ ভয়ংকর সব অপরাধে জড়াচ্ছে চট্টগ্রামের কিশোররা। গত ছয় বছরে ৫৪৮টি অপরাধের ঘটনায় তাদের জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। যাদের অধিকাংশ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। বিদ্যালয় কামাই করে তারা এসব অপরাধে জড়াচ্ছে বলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) এক জরিপে উঠে এসেছে। নগরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো এই জরিপে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতির হার আশঙ্কাজনক হারে কমছে। এ কারণে এসএসসি ও এইচএসসির নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নিতে ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছেন তারা। এতে কিশোর অপরাধও কমে আসবে। তবে এ-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় চূড়ান্ত পরীক্ষার অনুমতি দিতে বাধ্য হয় শিক্ষা বোর্ড।
তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২০২৩ সালের ক্লাসে উপস্থিতির হার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ক্লাসে ৭০ শতাংশ উপস্থিতির সংখ্যা খুবই কম। সিএমপি স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ৩৮৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে ক্লাসে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৮১ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর ২১ শতাংশ। এই প্রতিষ্ঠানে ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার ছিল ৫০ শতাংশের নিচে।

গুল-এ-জার বেগম সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ১১৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৩ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর ২৮ শতাংশ। ৫০ শতাংশের কম উপস্থিত ছিল ৬২ শিক্ষার্থী, যা মোট শিক্ষার্থীর ৫৩ শতাংশ। কাজেম আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ২৭৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে উপস্থিত মাত্র ৩৫ জন, যা মোট শিক্ষার্থীর ১৩ শতাংশ। ৫০ শতাংশের কম উপস্থিতি ছিল ৯৫ শিক্ষার্থীর, যা মোট শিক্ষার্থীর ৩৫ শতাংশ। তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের উপস্থিতির হার বেশি কম।

সিএমপির বিশেষ শাখার উপপুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, শিক্ষার্থীরা অপরাধে জড়ানোর সময় কোথায় পাচ্ছে, সেটা খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, তাদের অনেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হচ্ছে না। শ্রেণিকক্ষে বাধ্যতামূলক উপস্থিতির বিষয়টি না থাকায় শিক্ষার্থীরা ক্লাস চলাকালে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

সিএমপি সূত্র জানায়, ক্লাস কামাই করে শিক্ষার্থীরা কিশোর বয়সের ‘হিরোইজম’ দেখাতে বিরোধে জড়ায়। এসব বিরোধে খুনের ঘটনাও ঘটছে। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি নগরের জামালখানে খুন হন কলেজিয়েট স্কুলের আদনান ইসফার। এই ঘটনায় পাঁচ আসামিই তিনজনই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল নগরের চেরাগী পাহাড় মোড়ে খুন হন বিএএফ শাহীন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আসকার বিন তারেক ইভান। এ ঘটনায় জড়িতরাও বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী।
নগর পুলিশ শাখার এক প্রতিবেদন বলা হয়েছে, খুন ছাড়াও বিদ্যালয় কামাই করে শিক্ষার্থীরা কিশোর গ্যাং, পর্নোগ্রাফি, অসামাজিক কার্যকলাপ, অনলাইন গেম, জুয়া, সিগারেট ও মাদকাসক্ত হয়ে টাকা জোগাড়ের জন্য চুরি, ছিনতাই এবং মাদক বিক্রিতেও জড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া ক্লাস না করে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পার্ক, বিনোদন কেন্দ্র, রেস্টুরেন্ট, ডার্ক রেস্টুরেন্ট, মার্কেট এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে স্কুল-কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কিশোর অপরাধ কমাতে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করে সিএমপি কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় বলেন, ক্লাসে ৭০ শতাংশ উপস্থিতি না থাকলে শিক্ষার্থীদের এসএসসি ও এইচএসসির নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে বোর্ড সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেবে। ধারাবাহিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা এবং শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে খুদে বার্তার মাধ্যমে অভিভাবকদের জানানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এসব পদ্ধতি নিলে কিশোর অপরাধ অনেকটা কমে আসবে।

তবে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথ বলেন, ক্লাসে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক করার কোনো আইন নেই। অলিখিতভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতির জন্য কড়াকড়ি করে। আমরাও চাই এ বিষয়ে একটি আইন হোক।
ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিকান্দার খান বলেন, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। নয়তো তারা খেয়ালখুশিমতো নানা কাজ করবে। অপরাধে জড়াবে। এজন্য অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে।

ছয় কিশোর গ্যাংয়ের ৩৩ সদস্য গ্রেপ্তার
চট্টগ্রামে দেশি অস্ত্রশস্ত্রসহ ৩৩ যুবককে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব। তাদের মধ্যে ছয়টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের প্রধানসহ সদস্যরা রয়েছে। গত বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। র‍্যাব জানায়, আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে ছিনতাই ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধে এই সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়েছে।

 

আরও পড়ুন

×