কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত দেশের প্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল দিয়ে আগামী মার্চে শুরু হবে গাড়ি চলাচল। তাই বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে ১২ ধরনের যানবাহনের জন্য টোল হার প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করেছে সেতু কর্তৃপক্ষ। কর্ণফুলীর শাহ আমানত সেতুকে বিবেচনায় নিয়ে এ টোল হার নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই সেতুর চেয়ে গড়ে আড়াই গুণ বেশি টোল হার নির্ধারণ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে বিশেষ কমিটি। তবে কোনো কোনো যানবাহনে এ হার ছয় গুণ পর্যন্ত বেশি। প্রস্তাবনায় চার এক্সেলের ট্রেইলারে সর্বোচ্চ টোল ধরা হয়েছে ১ হাজার টাকা।

প্রাইভেটকারের জন্য সর্বনিম্ন টোল ধরা হয়েছে ২০০ টাকা। টানেলে মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও থ্রি হুইলার চলাচল করতে পারবে না।

বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রকল্প পরিচালক মো. হারুনুর রশিদ বলেন, 'বঙ্গবন্ধু টানেলের মূল কাজ শেষ হয়েছে। এখন চলছে সংযোগ সড়কসহ কর্ণফুলী নদীর দুই পাড়ের সড়ক নির্মাণের কাজ। গত ২৬ নভেম্বর কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রথম টিউবের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।'

সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা সেতু বিভাগের উপসচিব (উন্নয়ন) আবুল হাসান এর আগে সমকালকে বলেছিলেন, 'শাহ আমানত সেতুর টোল হার বিবেচনায় নিয়ে টানেলের টোল নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রস্তাবনা এখন অর্থ মন্ত্রণালয় আছে। সেখানে অনুমোদনের পর এটি গেজেট আকারে প্রকাশ করবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।'

কত গাড়ি চলবে টানেলে: টানেলের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সুপারিশে বলা হয়েছে, শুরুতে গাড়ি চলাচলের সংখ্যা একটু কম থাকবে। তবে ২০২৫ সালে গড়ে প্রতিদিন ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলাচল করবে। ২০৩০ সালে এসে যানবাহনের সংখ্যা হবে ৩৭ হাজার ৯৪৬টি। আর ২০৬৭ সালে যানবাহনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ৬২ হাজার। বিশিষ্টজনরাও বলছেন, শুরুতে হয়তো টানেলে প্রত্যাশার চেয়ে কম গাড়ি চলবে।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল হোসেন সমকালকে বলেন, 'মিরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ চালু হলে এবং মাতারবাড়ীতে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানা সচল হলে ব্যস্ততা বাড়বে টানেলের। টানেল ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামেও ধীরে ধীরে নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। পরবর্তী সময়ে এসবের প্রভাবে টানেলে যানবাহন চলাচল প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে আমার ধারণা।'

কেন এত বেশি টোল টানেলে: কর্ণফুলী নদীর ওপর ২০১০ সালে ৪৯০ কোটি টাকায় নির্মিত হয় শাহ আমানত সেতু। এই সেতু টানেলের চেয়ে সুবিধাজনক স্থানে নির্মিত হয়েছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে এ সেতু থাকায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে। এটি টানেলের চেয়ে তুলনামূলক বেশি প্রশস্ত। তাই টোল হার নির্ধারণ করতে গিয়ে এই সেতুকে বিবেচনায় আনতে হয়েছে সেতু বিভাগকে। প্রস্তাবিত টোল হারে তারা শাহ আমানত সেতুর টোল হারও উল্লেখ করেছে। সেতুর চেয়ে টানেল নির্মাণে বেশি খরচ হওয়ায় টোলও সেভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। টানেল নির্মাণে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এ টাকার বড় একটি অংশ সরকারকে টোল থেকেই আদায় করতে হবে। তবু প্রতিযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে গত ২০ ডিসেম্বর টানেলের টোল হার প্রস্তাব আকারে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে সেতু বিভাগ।

এর আগে কয়েক দফা এমন প্রস্তাবনা পাঠানো হলেও তাতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় সম্মতি দেয়নি। এ জন্য এবার সেতু কর্তৃপক্ষ টোল সম্পর্কিত একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে টোল হার চূড়ান্ত করে।

টোল হারের প্রস্তাবনায় যা আছে: শাহ আমানত সেতুতে প্রাইভেটকার ও জিপের টোল দিতে হয় ৭৫ টাকা। টানেল দিয়ে চলতে এসব গাড়িকে গুনতে হবে ২০০ টাকা। পিকআপের জন্য শাহ আমানত সেতুতে ১৩০ টাকা গুনতে হলেও টানেলে ধরা হয়েছে ২০০ টাকা। সেতুতে মাইক্রোবাস চালাতে দিতে হয় ১০০ টাকা, টানেলে গুনতে হবে আড়াই গুণ বেশি; ২৫০ টাকা। ৩১ আসনের কম ধারণক্ষমতার বাস সেতুতে ৫০ টাকা গুনলেও টানেলে দিতে হবে ৩০০ টাকা। এটি সেতুর তুলনায় ছয় গুণ বেশি। ৩২ আসনের বেশি ধারণক্ষমতার বাস সেতুতে ১৫৫ টাকা দিলেও টানেলে গুনতে হবে ৪০০ টাকা।

ভারী যানবাহনের টোল তুলনামূলকভাবে বেশি রাখা হয়েছে টানেলে। ৫ টন ধারণক্ষমতার ট্রাক সেতুতে ১৩০ টাকা দিলেও টানেলে দিতে হবে ৪০০ টাকা। একইভাবে ৫ থেকে ৮ টন ধারণক্ষমতার ট্রাক সেতুতে ২০০ টাকা দিলেও টানেলে ৫০০ টাকা; ৮ থেকে ১১ টন ধারণক্ষমতার ট্রাক সেতুতে ৩০০ টাকা দিলেও টানেলে ৬০০ টাকা, ৩ এক্সেল পর্যন্ত ট্রাক চলাচলে টানেলে টোল দিতে হবে ৮০০ টাকা। ৪ এক্সেল পর্যন্ত ট্রেইলারকে সেতুতে ৭৫০ টাকা দিতে হলেও টানেলে ১ হাজার টাকা টোল রাখা হয়েছে। এ ছাড়া গাড়ির এক্সেল বাড়লে প্রতি এক্সেলের জন্য অতিরিক্ত ২০০ টাকা টোল নির্ধারণ করা হয়েছে।