বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও শেরেবাংলা হলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগ নেতা মহিউদ্দিন আহম্মেদ সিফাতের অনুসারীরা। শেরেবাংলা হলের দুটি কক্ষ থেকে দুই শিক্ষার্থীকে বের করে দিয়ে সেখানে তোলা হয়েছে সিফাত সমর্থক ছাত্রলীগের দুই কর্মীকে। সিফাত সমর্থকদের বেপরোয়া তৎপরতা ও হুমকিতে ছাত্রলীগের অন্য গ্রুপগুলোর সমর্থক শিক্ষার্থীরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকে ভয়ে ক্যাম্পাসে যাচ্ছেন না।

গত মঙ্গলবার ভোরে মুখোশধারী একদল দুর্বৃত্ত হলের ৪০১৮ নম্বর কক্ষে ঢুকে মহিউদ্দিন আহম্মেদ সিফাতকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে এবং রড দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। এ সময় তাঁর দুই সহযোগীকেও মারধর করা হয়। বর্তমানে তাঁরা বরিশালের শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

শিক্ষার্থীদের একাধিক সূত্র জানায়, বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের ক্লাস ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রার্থীদের ফরম বিতরণ শুরু হওয়ার কথা ছিল। ওই দিন সিফাতের সমর্থকরা ক্লাস ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক অন্য শিক্ষার্থীদের ফরম কিনতে বাধা দেয় এবং বিভাগের চেয়ারম্যান ইশরাত জাহানের প্রতি কটূক্তি করেন। এতে ক্লাস ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফরম বিতরণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। অভিযোগ আছে, সিফাত সমর্থকরা এককভাবে তাঁদের প্যানেল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করতে এ তৎপরতা চালিয়েছেন।

শেরেবাংলা হলের ৩০১২ নম্বর কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী আশরাফুল আলম দ্বীপের অভিযোগ, বুধবার রাতে সিফাত সমর্থক ছাত্রলীগ কর্মীরা তাঁর কক্ষে ঢুকে চেয়ার, টেবিল, বিছানা ও বইপত্র ছুড়ে ফেলে দেন। ওই কক্ষ থেকে তাঁকে বের করে দিয়ে অন্য একজনকে কক্ষে তুলে দেন। আশরাফুল আলম দ্বীপ ছাত্রলীগের ইমন-জিসান গ্রুপের সমর্থক। তিনি এখন বঙ্গবন্ধু হলে বন্ধুর কক্ষে উঠেছেন।

একই রাতে শেরেবাংলা হলের পঞ্চম তলার ৫০১০ নম্বর কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম তুহিনের কম্পিউটার, বিছানা ও বইপত্র ফেলে দেন সিফাতের সমর্থকরা। ঘটনার সময় তুহিন বাইরে ছিলেন। জানা গেছে, সিফাতের ওপর হামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজ মোল্লার সমর্থক তুহিন। একই হলের আরেক শিক্ষার্থী মুস্তাকিমকে হল ছাড়ার জন্য হুমকি দিয়েছেন সিফাত সমর্থকরা। সিফাতের ওপর হামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া আরেক ছাত্রলীগ নেতা আলীম সালেহীর সমর্থক মুস্তাকিম। শেরেবাংলা হল ও বঙ্গবন্ধু হলে প্রতিদিনই নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো ও মারধরের ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

এসব পদক্ষেপ ছাড়াও সিফাত সমর্থকরা (সিফাতের ওপর হামলার প্রতিবাদে এবং আসামিদের গ্রেপ্তার দাবিতে) ক্যাম্পাসে প্রতিদিন মানববন্ধন, সমাবেশ, মশাল মিছিলসহ কর্মসূচি পালন করছেন।

শেরেবাংলা হলের প্রভোস্ট আবু জাফর মিয়া গতকাল শুক্রবার বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে তিনি শেরেবাংলা হল পরিদর্শন করেছেন। হলের দুটি কক্ষের দু'জন শিক্ষার্থীকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনা সত্য। ওই দুই কক্ষে যাঁদের তুলে দেওয়া হয়েছে তাঁদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবু জাফর বলেন, হলের শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি অব্যাহত রাখা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হল প্রশাসন তৎপর রয়েছে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মহিউদ্দিন আহম্মেদ সিফাত বলেন, তাঁর কিছু সমর্থক হামলাকারীদের সহায়তাকারী মনে করে দুই শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দিয়েছেন। তবে এ রকম ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য সমর্থকদের নির্দেশ দিয়েছেন। লোকপ্রশাসন বিভাগের ক্লাস ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধের ব্যাপারে সিফাত বলেন, ওই নির্বাচনে ভিপি প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন তাঁর সমর্থক জিএম ফাহাদ। তিনিও মঙ্গলবার হামলায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন। এ জন্য নির্বাচন পিছিয়ে দিতে ফরম বিক্রিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। তবে কাউকে গালাগাল করা হয়নি।

এসব বিষয়ে প্রক্টর খোরশেদ আলম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাঁরা সচেষ্ট। শেরেবাংলা হল থেকে বৈধ শিক্ষার্থীদের নামিয়ে দেওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে প্রভোস্টকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। কোনোভাবেই তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে দেবেন না।
মহিউদ্দিন আহম্মেদ সিফাত বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা। ২০১২ সালে স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত ছাত্রলীগের কোনো কমিটি হয়নি। সিফাত বরিশাল সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর অনুসারী।