জেলার নগরকান্দা উপজেলাকে ভূমিহীনমুক্ত ঘোষণা করার পর এবার জেলার আলফাডাঙ্গা ও সালথা এ দুটি উপজেলাকেও ভূমিহীনমুক্ত ঘোষণা করা হবে। আগামীকাল বুধবার (২২ মার্চ) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে সারাদেশের অন্যান্য এলাকার সঙ্গে এ দুটি উপজেলাকেও ভূমিহীনমুক্ত ঘোষণা করবেন। 

একবছরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের জীবযাপনের চালচিত্রের তথ্য সংগ্রহে গেলে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের ‘স্বপ্ননগর’ আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা ছবেদা বেগম (২১) বলেন, মাত্র একবছর আগেও তারা ছিলেন ভূমিহীন। মাথা গোঁজার কোন ঠাঁইও ছিল না। স্বামী রাসেল মোল্যা একজন ভাঙারি ব্যবসায়ী। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকতেন রাস্তার পাশে ঘর তুলে। এখন নিজেদের একটা ঠিকানা হয়েছে। যেটি তাদের জীবনসংগ্রাম এগিয়ে নিতে জীয়নকাঁঠির মতো কাজ করেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গৃহীত মুজিব শতবর্ষে এই আশ্রয়ণ প্রকল্প সমাজের একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের হতদরিদ্রদের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তাদের স্বাস্থ্য, গড় আয়ু, শিক্ষা, আয় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

ফরিদপুর জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় আশ্রয়ণ প্রকল্প এই স্বপ্ননগর। যেখানে তিন শতাধিক ঘর তৈরি করা হয়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য। এই স্বপ্ননগরে ভূমিহীনদের জমিসহ ঘরের পাশাপাশি সেখানে স্থাপন করা হয়েছে একটি মসজিদ, জেলা প্রশাসক স্কুল নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও একটি মাছ বাজার। আলফাডাঙ্গার উপর দিয়ে প্রবাহিত মধুমতি নদীর ভাঙনের কবলে নিঃস্ব পরিবারসহ ভূমিহীনদের আশ্রয় এই স্বপ্ননগর। 

এখানে বসবাসরত অনেকেরই জীবন বদলে যাওয়ার গল্প তৈরি হয়েছে। যাদের কিছুদিন আগেও কোনো বসতবাড়ি ছিল না, অন্যের বসতবাড়িতে থাকতে হতো।

জানা গেছে, সরকার ঘোষিত ‘মুর্জিব শতবর্ষে থাকবে না কেনো গৃহহীন’ কর্মসূচিতে ‘সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প-২’র আওতায় ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় তিনটি ধাপে ৭৩৫টি ভূমিহীন পরিবারকে ২ শতাংশ জমিসহ ঘরে উপহার দেওয়া হয়েছে। সালথা উপজেলায় ঘর পেয়েছে ৬৩৩টি ভূমিহীন পরিবার। জেলায় সবমিলিয়ে পাঁচ হাজার ২০০টির বেশি ভূমিহীন পরিবার এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের উপকারভোগী রয়েছেন। এরই মধ্যে তারা তাদের ঘরগুলোতে কেউ কৃষি খামার, কেউবা হাঁসমুরগির খামার গড়ে তুলছেন। ঘরের আঙিনায় লাগানো হয়েছে পুঁই, সিমসহ নানাপ্রকারের সবজি, গাছপালা।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো. কামরুল আহসান তালুকদার বলেন, ‘ফরিদপুরের আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিস্থিতি খুবই ভালো। আমাদের যেই কর্মপরিকল্পনা ছিল সেটি খুব ভালোভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। আগামী ২২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ফরিদপুরে ৪৪৭টি ঘর উদ্বোধন করবেন। আমাদের পরিকল্পনা ছিলো পাঁচ হাজার ৭২৭টি ঘর নির্মাণের। এ পর্যন্ত পাঁচ হাজার ২০৩টি নির্মাণ করেছি। আর প্রায় ৫০০ বাকি। আশা করছি জুনের আগেই বাকি ঘরগুলো নির্মাণ সম্পন্ন করতে পারব।’

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমাদের সালথা এবং আলফাডাঙ্গা উপজেলা দুটি ভূমিহীনমুক্ত ঘোষণা করা হচ্ছে। এখানকার জনপ্রতিনিধি, সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা, সুশীল সমাজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক সকলের সাথে বৈঠক করে নিশ্চিত হয়েছি, এখানে আর কোনো ভূমিহীন নেই। অনেকের গৃহ নেই, কিন্তু জমি আছে। আমরা তাদের বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছি। তাদেরকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে গুচ্ছ গ্রাম একটি প্রকল্প চালু আছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করব।’

জেলা প্রশাসক জানান, গত দেড় বছরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের উপকারভোগীদের নিয়ে একটি শুমারি করেছি। তাতে দেখেছি, এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে উপকারভোগীদের মাসিক উপার্জন ছিল গড়পরতায় ৬ হাজার টাকা। আশ্রয়ণ প্রকল্পে আসার পর তাদের উপার্জন ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকার মতো হয়েছে। এছাড়া জেলার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৯৭ শতাংশ ঘরে মানুষ বসবাস করছেন। সেখানকার বাসিন্দাদের তাদের স্বাস্থ্য, গড় আয়ু, শিক্ষা, আয় প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

আশ্রয়ণে থাকার আগে তাদের যে উপার্জন হতো, এখানে আশ্রয় পাওয়ার পরে আমরা তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ায় তাদের আয়বর্ধক পথ বেড়েছে। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে উপার্জন বেড়েছে। তাদের স্বাস্থ্য সেবা বেড়েছে। তারা সন্তানদের শিক্ষাদিক্ষা দিয়ে মানুষ করতে পারছে। তাদের দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।