ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

ঈশ্বরদীর বেনারসি পল্লিতে ঈদেও নেই প্রাণচাঞ্চল্য

ঈশ্বরদীর বেনারসি পল্লিতে ঈদেও নেই প্রাণচাঞ্চল্য

ঈদের আগে দম ফেলার ফুরসত মিলত না কারিগরদের। কিন্তু এবার পাবনার ঈশ্বরদীর বেনারসি পল্লিতে নেই কর্মব্যস্ততা সমকাল

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী (পাবনা)

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪ | ২৩:৩৩

বছর তিনেক আগেও ঈশ্বরদীর তৈরি বেনারসি শাড়ি ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো। দফায় দফায় সুতাসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে ভারতীয় শাড়ির সহজলভ্যতার কারণে এক সময়ের প্রাণচাঞ্চল্যময় ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লিতে এবার ঈদের আগেও নেই ব্যস্ততা। কারিগররা ঈদ মৌসুমেও অলস সময় পার করছেন। বেনারসি পল্লিকে ঘিরে গড়ে ওঠা শাড়ির মার্কেটও প্রায় ক্রেতাশূন্য।

ঈশ্বরদীর ফতেহমোহাম্মদপুর এলাকার বেনারসি পল্লি ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা শতবর্ষ পুরোনো ঐতিহ্যবাহী এ বেনারসি পল্লি ঈদ এলেই তাঁতের খটখট শব্দ, আর ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠত। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন। এতে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।

কিছুদিন আগেও দক্ষ কারিগরের নিখুঁত বুননের জন্য এখানকার তাঁতের তৈরি বেনারসি শাড়ির ব্যাপক কদর ছিল। করোনা মহামারির পর দফায় দফায় সুতার দাম বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট ও দেশীয় বাজারে ভারতীয় শাড়ির সহজলভ্যতায় বেনারসি পল্লির অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। লোকসান গুনে গুনে দিশেহারা হয়ে এরই মধ্যে অনেকেই তাদের কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন। পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন অনেক কারিগর। তাদের কেউ কেউ রিকশা চালিয়ে কিংবা নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।
বেনারসি পল্লির বাসিন্দা ঈশ্বরদী শিল্প ও বণিক সমিতির সাবেক নির্বাহী সদস্য আনোয়ার হোসেন খান আল-আমিন জানান, এখানে এক সময় ৪৫০টি বেনারসি কারখানা ছিল। হাজার হাজার কারিগর কাজ করতেন। এখন মাত্র ৫০টি চালু আছে। ভারতীয় নিম্নমানের শাড়িতে দেশের বাজার সয়লাব ও দফায় দফায় সুতা, চুমকিসহ তাঁত সামগ্রীর দাম বৃদ্ধির কারণে লোকসানে পড়ে অনেকেই বেনারসি তাঁত শিল্প থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন।

আল-মদিনা বেনারসি সিল্ক হাউসের মালিক সেলিম বেনারসি জানান, আগে ঈদ এলেই দিনরাত কাজ করতে হতো শ্রমিকদের। শাড়ির ব্যাপক চাহিদাও ছিল। এখন বাজারে ভারতীয় শাড়ি সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে আমাদের শাড়ির চাহিদা কমে গেছে। বিদেশি শাড়ির সঙ্গে এর পার্থক্য হলো– ঈশ্বরদীর বেনারসি শাড়ি হ্যালো লুমে বুনানো হয়। ফলে গুণগতমান ও টেকসই অনেক বেশি হয়। বাহারি ডিজাইনের জন্য এ বেনারসি শাড়ি সারাদেশে এক নামে পরিচিত।
মদিনা টেক্সটাইলের শ্রমিক সোলেমান হোসেন জানান, এখানে তৈরি বেনারসি শাড়ি দুই হাজার থেকে শুরু করে ২৫ হাজার টাকা দামে বিক্রি হয়। তবে এ বেনারসি পল্লিতে ক্যালেন্ডার মেশিন না থাকায় তৈরি শাড়ি ঢাকার মিরপুরে নিয়ে ক্যালেন্ডার করে বাজারজাত করতে হয়। এতে প্রতিটি শাড়ির জন্য তাদের অতিরিক্ত ৩০০-৪০০ টাকা খরচ গুনতে হয়।

শামীম বেনারসির কারিগর জাহিদুল ইসলাম বলেন, ৩৫ বছর ধরে বেনারসি পল্লিতে তাঁতের কারিগর হিসেবে কাজ করছি। এবারের ঈদের মতো খারাপ সময় আগে কখনও দেখিনি।
ঈশ্বরদী বেনারসি তাঁতি সমিতির সভাপতি ওয়াকিল আলম বলেন, প্রতি বছর ঈদে বেনারসি শাড়ির যে চাহিদা ছিল, এবার তার অর্ধেকও নেই। এখানকার বেশির ভাগ তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। শাড়ির ন্যায্য মূল্য না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন।

শামীম বেনারসি কারখানার স্বত্বাধিকারী শামীম হোসেন বলেন, বেনারসি শাড়ির ব্যবসা ধ্বংসের পথে। অন্য বছর ঈদে কমবেশি শাড়ির চাহিদা থাকত; এবার একেবারে নেই। কারিগরদের বেতন দিতে পারছি না।
বেনারসি পল্লির গাউছিয়া মার্কেটের ‘পল্লি বেনারসি’র মালিক সাঈদ হোসেন রুবেল বলেন, তাঁর কারখানায় ২২টি তাঁতের মধ্যে এখন মাত্র পাঁচটি চলছে। ঈদে শাড়ির কোনো চাহিদা ও অর্ডার নেই। আগে এখানকার শাড়ি টাঙ্গাইল ও ঢাকার মিরপুরের ব্যবসায়ীরা কিনতেন। এবার ঈদে তারা কোনো অর্ডার দেননি।

ঈশ্বরদী বেনারসি পল্লির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমান জানান, সরকারি উদ্যোগে তাঁতিদের মধ্যে ঋণ সুবিধা দিয়ে এ বেনারসি পল্লির কারখানাগুলো চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

 

আরও পড়ুন

×