ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

সেতু নির্মাণের স্থান সরিয়ে চেয়ারম্যানের বাড়ির কাছে

সেতু নির্মাণের স্থান সরিয়ে চেয়ারম্যানের বাড়ির কাছে

সাটুরিয়ার বরাইদ ইউনিয়নের গোপালপুর-রাজৈর খেয়াঘাটে সেতু না থাকায় নৌকায় পারাপার হতে হয় গ্রামবাসীকে সমকাল

জাহাঙ্গীর আলম, (সাটুরিয়া) মানিকগঞ্জ

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৪ | ০০:২৯

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় বুয়েটের নকশা অনুযায়ী সেতু নির্মাণ না করে ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়ির কাছে করার উদ্যোগ নেওয়ায় উপজেলা প্রকৌশলী ও ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নের গোপালপুরসহ ২০ গ্রামের প্রায় দুই হাজার মানুষ এ বিষয়ে গণস্বাক্ষর দিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
ধলেশ্বরী নদীর দুই পাড়ে বসবাসকারী স্থানীয়দের অভিযোগ, বুয়েটের নকশা অনুযায়ী উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নের গোপালপুর-রাজৈর খেয়াঘাটে সেতু নির্মাণ না করে উপজেলা প্রকৌশলীকে অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে বরাইদ ইউপি চেয়ারম্যান তাঁর বাড়ির সামনে দিয়ে সেতুটি নির্মাণ করার জন্য গোপনে নতুন নকশা করেছেন। চেয়ারম্যানের নকশা অনুযায়ী সেতুটি নির্মাণ করা হলে প্রায় ৫০ গ্রামের মানুষকে এক কিলোমিটার ঘুরে আসতে হবে। সেতুটি বুয়েটের নকশা অনুযায়ী হলে কৃষক, শিক্ষার্থীসহ প্রায় ৩০ হাজার মানুষের উপকারে আসবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়ক হবে। বুয়েটের নকশা অনুযায়ী সেতু নির্মাণ না হলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষেরও আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।

গত শুক্রবার ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বরাইদ ইউনিয়নের গোপালপুর বাজার, গোপালপুর উচ্চ বিদ্যালয়, দরগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়, দরগ্রাম সরকারি ভিকু মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজ, দরগ্রাম সিনিয়র আলেয়া মাদ্রাসা ও সরকারি ৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাজৈর খেয়াঘাট দিয়ে পারাপার হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। এ ছাড়া টাঙ্গাইলের নাগরপুর, মানিকগঞ্জের ঘিওর, দৈলতপুর এলাকার মানুষ এ ঘাট দিয়ে চলাচল করে থাকেন। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে সাটুরিয়া এলজিইডি প্রথমে গোপালপুর রাজৈর মাইনকার খেয়াঘাট দিয়ে বুয়েটকে দিয়ে সেতুর নকশা তৈরি করে। সেতুটি নির্মাণের জন্য রাজৈর মাইনকার খেয়াঘাট দিয়ে কয়েক ধাপে নদী শাসনের কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু বরাইদ ইউপি চেয়ারম্যান বুয়েটের নকশা বাতিল করে প্রায় ১ কিলোমিটার উত্তরে সরিয়ে নেন।
বিষয়টি এলাকাবাসী জানতে পেরে সেতুটি বুয়েটের নকশা অনুযায়ী করার জন্য সংসদ সদস্য, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, জেলা প্রশাসক, প্রকল্প পরিচালক, মানিকগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ১ মে লিখিত অভিযোগ করেন। এতে উপজেলার আট ইউপি চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা স্বাক্ষর করেছেন।

গোপালপুর বাজারের ব্যবসায়ী আপেল মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পরিদর্শন শেষে বুয়েটের একটি টিম গোপালপুর বাজার-সংলগ্ন মাইনকার খেয়াঘাটে সেতুটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। সে অনুযায়ী প্রাথমিক অ্যালাইনমেন্ট নকশা প্রণয়ন করে সব কাজ শেষে টেন্ডারের ঘোষণা দেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ইউপি চেয়ারম্যান গাজী আব্দুল হাই উপজেলা প্রকৌশলী নাজমুল করিমকে অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে সেতুটি আনুমানিক এক কিলোমিটার দূরে তাঁর নিজ বাড়ির সামনে দিয়ে নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করেন। এ স্থানে সেতু নির্মাণ হলে প্রায় ৩০ হাজার লোকের যাতায়াত বিঘ্নিত হবে।
ধুলট গ্রামের আব্দুর রহমান বলেন, সেতুটি উত্তর দিকে পরিবর্তন হলে শতাধিক আধাপাকা ঘর, বসতবাড়ি, ৩টি কবরস্থান, ১টি মসজিদ ভাঙা পড়বে। ফলে সরু রাস্তার সঙ্গে সেতুর কানেকটিং রাস্তা ও প্রশস্ত অ্যাপ্রোচ নির্মাণের জন্য প্রচুর বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনা ভাঙার ক্ষতিপূরণ প্রদানের কারণে সরকারকে অতিরিক্ত কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে।
রাজৈর গ্রামের জিয়াউর রহমান বলেন, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারে জনগণের সর্বোচ্চ সুফল প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সেতুটি নির্মাণের জন্য বুয়েট কর্তৃক নির্ধারিত প্রথম প্রস্তাবিত মাইনকার খেয়াঘাট বরাবর করা প্রয়োজন।

গোপালপুরের মো. মিহির আলী জানান, ৫ বছর ধরে শুনে আসছেন সেতু নির্মাণ হবে গোপালপুর-রাজৈর ঘাটে। এখন শুনছেন চেয়ারম্যানের বাড়ির কাছে হবে। কোনো অবস্থাতেই সেতুটি গোপালপুর বাজারের উত্তরে নির্মাণ করতে দেবেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চর রাজৈরের লালচান মিয়া ও গোলাম মোস্তফা জানান, সেতুটি গোপালপুর বাজারের কাছে না হলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। প্রয়োজনে সেতুর কোনো নির্মাণসামগ্রী অন্য স্থানে নিয়ে যেতে দেবেন না। শিগগির ভুল সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এলে তারা সেতু সঠিক স্থানে নির্মাণের জন্য মানববন্ধনসহ বৃহত্তর কর্মসূচি গ্রহণ করবেন।
বরাইদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গাজী আব্দুল হাই জানান, বরাইদ ইউনিয়নের বৃহৎ স্বার্থেই সেতুটি যথাস্থানে নির্মিত হচ্ছে। এখানে তাঁর কোনো হাত নেই। প্রকৌশলীরা যেখানে ভালো মনে করেছেন, সেখান দিয়েই সেতু নির্মাণের প্রস্তাব করেছেন।

সাটুরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী নাজমুল করিম তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রথমে বুয়েটের নকশা অনুযায়ী গোপালপুর মাইনকার খেয়াঘাটে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। পরে প্রকল্প পরিচালকের অফিস গোপালপুরের মজিদের বাড়ির কাছ থেকে নকশা করে। এর পর তৃতীয়বার চেয়ারম্যান গাজী আব্দুল হাইয়ের বাড়ির কাছ থেকে নকশা করা হয়। সর্বশেষ নকশা অনুযায়ী সেতু নির্মাণের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন।

আরও পড়ুন

×