ঢাকা বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

পাচারের টাকা ও গরু নিয়ে খুনাখুনি কক্সবাজারে

পাচারের টাকা ও গরু নিয়ে খুনাখুনি কক্সবাজারে

প্রতীকী ছবি

 ইব্রাহিম খলিল মামুন, কক্সবাজার

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৪ | ১০:৫১

মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেও দেশটি থেকে বাংলাদেশে গরু-মহিষ চোরাচালান থামেনি। কক্সবাজারের রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ির ফুলতলী, লম্বাশিয়া, ভাল্লুক খাইয়া, চাকঢালা, দৌছড়িসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিনই অবৈধভাবে দেশে ঢুকছে শত শত গরু-মহিষ।

পাচারের এই গরুর টাকার ভাগ নিয়ে কক্সবাজারে আবার চলছে খুনাখুনি। রামুতে গত চার মাসে এ নিয়ে দ্বন্দ্বে পাঁচটি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এ ছাড়া গরু আনতে গিয়ে সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে অনেকেই আহত হচ্ছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, ডাকাত ও ব্যবসায়ীরা এই চোরাচালানে জড়িত। পাহাড়ে অবস্থান করা ডাকাত দলের পাহারায় অবৈধভাবে আসা গরু সীমান্ত পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছায়। বেশি টাকা পাওয়ায় অপরাধীদের পাশাপাশি চোরাচালানে যোগ দিচ্ছেন শ্রমজীবী ও বেকাররা। 

তারা আরও অভিযোগ করেন, টাকার একটি ভাগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পায়। এ কারণে গরু চোরাচালান থামাতে তেমন তৎপরতা চোখে পড়ে না। এতে দিন দিন অশান্ত হয়ে উঠছে উপজেলা দুটি।

সর্বশেষ রামুর পাহাড়ি জনপদ গর্জনিয়া ইউনিয়নে আবুল কাশেম (৪০) নামে এক কৃষককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গত বুধবার রাত ২টার দিকে তাঁকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে পাশের নারাইম্মাঝিরি পাহাড়ে হত্যা করা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে কাঠুরিয়ারা লাশ দেখে পরিবারকে জানান। কাশেমের বাড়ি ওই ইউনিয়নের বড়বিল এলাকায়। 

তাঁর ছোট ভাই শহীদুল্লাহ জানান, ৩০-৪০ জনের ডাকাত দল ভারী অস্ত্র নিয়ে তাঁর ভাইকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। তাঁর দাবি, গরু পাচারে বাধা দেওয়ায় তাঁর ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। 

রামুতে পাঁচ হত্যাকাণ্ডের চারটিই হয়েছে গর্জনিয়া ইউনিয়নে। এর আগে ২১ এপ্রিল গরু পাচারকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের গোলাগুলিতে বাবা-ছেলে প্রাণ হারান। এ নিয়ে ওই ইউনিয়নে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। 

রামু থানার ওসি আবু তাহের দেওয়ান জানান, কাশেম হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। তবে শুক্রবার পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। একের পর এক হত্যা নিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। 

এদিকে গরু-মহিষ আনতে গিয়ে মিয়ানমারের ভেতর দেশটির সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহীদের পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে অনেকেই আহত হচ্ছেন। সর্বশেষ ৫ মে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে জারুলিয়াছড়ি সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিন বাংলাদেশি আহত হন। তারা হলেন– রশিদ উল্লাহ, মোহাম্মদ মফিজ উল্লাহ ও মো. আব্দুল্লাহ। তাদের সবার বাড়ি রামুর মৌলভীকাটা গ্রামে। এর আগের রাতে একই এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে আহত হন আরও দুই বাংলাদেশি।

মাইন বিস্ফোরণে দুই পা হারিয়ে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ জানান, তিনি দিনমজুরের কাজ করতেন। দিনে পেতেন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। কিন্তু মিয়ানমার থেকে একটি গরু-মহিষ বাংলাদেশের মহাজনের হাতে তুলে দিলে মেলে ২ হাজার টাকা। একটু বেশি আয় করার লোভে দুই বছর আগে গরু চোরাচালানে যোগ দেন তিনি। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে সক্রিয় রয়েছে একাধিক চোরাচালান চক্র। অন্য পণ্যের পাশাপাশি সন্ধ্যা নামলেই ফুলতলীর পথ দিয়ে চোরাই গরু আনার কাজ শুরু হয়। এর পর এশার নামাজের পর রাস্তায় লোকজন কমে গেলে গরুর পাল প্রশাসন ও বিজিবি টহল দলের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। এসব গরু রাখা হয় বিভিন্ন পাহাড় ও খামারে। পরে বাজার ইজারাদারের কাছ থেকে রসিদ সংগ্রহ করে খামারি পরিচয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এতে একদিকে সরকার হারাচ্ছে মোটা অঙ্কের রাজস্ব, আবার দেশের খামারিরা হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত।

অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে চোরাচালানে রাজধানীর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী থেকে স্থানীয় প্রভাবশালীদের নাম এসেছে। এর মধ্যে যুবলীগ নেতা শাকিল আদনান ও ছাত্রলীগ নেতা তারেক উদ্দিনের নাম এসেছে একাধিকবার। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্থানীয় যুবদল নেতা আনোয়ার, ব্যবসায়ী নেতা এরশাদ উল্লাহ, যুবলীগ নেতা জহিরুল ইসলাম, কৃষক দল নেতা দেলোয়ার ও বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরের নাম এসেছে। 

তাদের মধ্যে ছাত্রলীগ নেতা তারেক উদ্দিন দাবি করেন, তিনি চোরাচালানে যুক্ত নন। তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মিথ্যা অপবাদ ছড়াচ্ছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রফিকুল ইসলাম বলেন, সীমান্তে পুলিশের কোনো কাজ নেই। তবে পুলিশের নাম ব্যবহার করে কেউ চাঁদা নিয়ে থাকলে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর চোরাচালানে জড়িতদের ধরতে পুলিশের অভিযান চলমান আছে।

আরও পড়ুন

×