ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪

উত্তরের বালুতে ‘গুপ্তধন’

উত্তরের বালুতে ‘গুপ্তধন’

গাইবান্ধার দাড়িয়াপুরের মোল্লারচর, এ বালুচরেই উঁকি দিচ্ছে সম্ভাবনার হাতছানি। ছবি: সমকাল

 লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৪ | ১১:১০ | আপডেট: ১১ মে ২০২৪ | ১১:৪৬

গাইবান্ধা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে দাড়িয়াপুর। ছোট্ট বাজারের পাশ দিয়ে আরও সাত কিলোমিটার গেলে কামারজানী লঞ্চঘাট। এ ঘাট থেকে কিছুক্ষণ পরপর যমুনার জল মাড়িয়ে যাত্রীবাহী নৌকা ছুটছে দূরের মোল্লারচরে। উজানভাটি মিলিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টার এ নৌযাত্রা। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। নেই গাছপালা, প্রাণিকুল। আরও কিছুটা দূর এগিয়ে দেখা মেলে এক বিশাল বালুচরের। নাম মোল্লারচর। বিশেষ কারণে এ চর হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ। নির্জন এ চরে নৌকা ভিড়তেই চারপাশের সাদা বালুকণা চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। চিকচিক করা এ বালুকণার পেছনে আছে ভিন্ন এক গল্প। নদীর এ অংশে লুকিয়ে আছে হাজার কোটি টাকার ‘গুপ্তধন’। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখানকার বালুতে থাকা মূল্যবান খনিজ যথাযথভাবে উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাত করা গেলে দেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে দেওয়া সম্ভব।

উজান থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্র নদ গাইবান্ধার সাঘাটায় এসে নাম ধারণ করেছে যমুনা। এ স্থানেই আবার মিলিত হয়েছে তিস্তা নদী। পানিপ্রবাহ কম থাকায় যমুনা-ব্রহ্মপুত্রে জেগে উঠেছে ধু-ধু বালুচর। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) বিভিন্ন নদনদীর বালু থেকে ফ্লো-শিট নিরূপণসহ মূল্যবান মিনারেল আলাদা করার জন্য জয়পুরহাটে একটি মিনারেল প্রসেসিং কেন্দ্র স্থাপন করে। সেখানে গবেষণা করে ইনস্টিটিউট অব মাইনিং, মিনারোলজি অ্যান্ড মেটালারজি (আইএমএমএম) ব্রহ্মপুত্র নদের বালুতে ৩ থেকে ৫ শতাংশ মূল্যবান খনিজ পদার্থ আছে বলে নিশ্চিত করে। 

এ ছাড়া আইএমএমএম, বিসিএসআইআর যৌথভাবে রয়্যাল মেলবোর্ন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আরএমআইটি) ও কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের (সিএসআইআর) তত্ত্বাবধানে মূল্যবান এসব খনিজ আহরণের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালান। তাদের গবেষণা প্রবন্ধ (থিসিস) একটি আন্তর্জাতিক মানের সমীক্ষা প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচিত হয়। ওয়েবসাইটে এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পর নদনদীর খনিজ উত্তোলনে বহুজাতিক মাইনিং কোম্পানিগুলো বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

আইএমএমএমের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. প্রদীপ কুমার বিশ্বাস জানান, প্রতিবছর প্রাকৃতিকভাবে ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে নতুন করে ৫ মিলিয়ন টন মূল্যবান ভারী খনিজ কণিকা জমা হয়। আর এখান থেকেই বছরে কমপক্ষে ২৫০ মিলিয়ন টন (আগে থেকেই জমে থাকা) খনিজসমৃদ্ধ বালু সংগ্রহ করা সম্ভব। ব্রহ্মপুত্র নদের পুরোনো চরে ১০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত স্থানে ৩২ বিলিয়ন টন বালু রয়েছে। এর মধ্যেও উল্লিখিত খনিজ রয়েছে। এ ছাড়া কিছু নমুনায় মহামূল্যবান প্লাটিনাম, প্যালেডিয়াম, ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের অস্তিত্ব মিলেছে। অদূর ভবিষ্যতে সুযোগ তৈরি হলে বালু থেকে এসব মহামূল্যবান ধাতু আলাদা করতে গবেষণা কার্যক্রম চালানো হবে।

মিলেছে মূল্যবান খনিজ পদার্থ 

জয়পুরহাটের আইএমএমএমের গবেষণাগারে পরীক্ষার জন্য চর থেকে ১ হাজার ৫০০ টন বালু তুলে খনিজ আলাদা করা হয়। বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রতি টন বালু থেকে ২ কেজি ইলমিনাইট, ২০০ গ্রাম রুটাইল, ৪০০ গ্রাম জিরকন, ৩ দশমিক ৮ কেজি ম্যাগনেটাইট, ১২ কেজি গার্নেট ও ৫০ কেজি কোয়ার্টজ মিনারেল পাওয়া যায়।

প্রতিষ্ঠানটির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শাহ আলম ও সোহেল রানা বলেন, রং, প্লাস্টিক, ওয়েল্ডিং রড, কালি, খাবার, কসমেটিকস ও ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় রুটাইল। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইতালি, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, সিয়েরা লিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র মূল্যবান এ খনিজটি সারাবিশ্বে রপ্তানি করে। জিরকন ব্যবহৃত হয় সিরামিক, টাইলস, রিফ্যাক্টরিজ ও মোল্ডিং সেন্ডসে। এটি অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, চীন, ব্রাজিল, সিয়েরা লিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি করে।

ইস্পাত উৎপাদন, খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা পরিষ্কার এবং তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে গভীর কূপ খননে ব্যবহার হয় ম্যাগনেটাইট। দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া মূল্যবান এ খনিজ সারাবিশ্বে রপ্তানি করে থাকে। গার্নেট হলো ভারী ও মূল্যবান খনিজ। এটি ব্যবহার করা হয় শিরীষ কাগজ উৎপাদন, লোহাজাতীয় পাইপ পরিষ্কার ও বালুতে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য। অস্ট্রেলিয়া ও ভারত সারাবিশ্বে খনিজটি রপ্তানি করে।

আইএমএমএমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১০ মিটার গভীরতায় মাইনিং কার্যক্রম ও আলাদা মিনারেলের আন্তর্জাতিক বাজারদর ৩৬৩ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ব্রহ্মপুত্র নদে বালু প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ টন খনিজ পাওয়া সম্ভব।

বিদেশি কোম্পানির আগ্রহ

অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানি এভারলাস্ট মিনারেলস লিমিটেড ব্রহ্মপুত্র নদের বালুচরে অনুসন্ধান কাজ শেষ করেছে। তারা মাইনিং লাইসেন্স ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। এভারলাস্টের মহাব্যবস্থাপক বাহারুল আলম বিশ্বাস বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের মূল্যবান খনিজ সম্পদ আহরণে গাইবান্ধায় ২ হাজার ২৯৫ হেক্টর বালুচর আমরা লিজ নিতে চাই। আমরা এ অংশে সার্ভেও করেছি।

কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নিজ খরচে খনিজ আহরণের পর সরকারকে মোট মূল্যের ৪৩ শতাংশ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আবেদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এখনও সরকারের তরফ থেকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

লুকিয়ে আছে মূল্যবান সম্পদ

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, উত্তরের নদনদীর বালু নবদিগন্তের সূচনা করতে পারে। দেশের জন্যও এটি বড় পাওয়া। এ বালু ছাড়াও উত্তরবঙ্গে পাঁচটি খনি আছে। জয়পুরহাটে মাটির নিচে বিশাল আকারে ২ হাজার ৫২৭ কোটি টন চুনাপাথর আছে। টনপ্রতি ৩০ ডলার ধরলেও এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৫ হাজার ৮১০ কোটি ডলার। এটাও তোলা যাচ্ছে না। ব্রহ্মপুত্র নদে খনিজ বালু এখন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এ বালু তুলতে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নিতে হবে। এই সম্পদ সুপরিকল্পিত ব্যবহার প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত উত্তরের বিভিন্ন জেলায় খনিজ সম্পদ মজুত সম্পর্কে তথ্য দেওয়া রয়েছে। এর মধ্যে জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে ১০৫ কোটি ৩০ লাখ, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় ১০ কোটি ২০ লাখ, রংপুরের খালাসপীরে ১৪ কোটি ৩০ লাখ ও দিনাজপুরের দীঘিপাড়ায় ৪০ কোটি ২০ লাখ টন কয়লার মজুত রয়েছে। চুনাপাথর মজুতের বিষয়ে জিএসবি বলছে, দেশে সবচেয়ে বেশি চুনাপাথর মজুত রয়েছে নওগাঁয়। জেলায় তাজপুর, বদলগাছী, ভগবানপুরে আড়াই হাজার কোটি টনের বেশি চুনাপাথর মজুত আছে। জয়পুরহাট সদরে ১০ ও পাঁচবিবি উপজেলায় ৫ কোটি ৯০ লাখ টন চুনাপাথরের মজুত আছে। এ ছাড়া দিনাজপুরের হাকিমপুরে আকরিক লৌহ মজুত রয়েছে ৬৫ কোটি টন। এখানকার নদীতে কাচ-বালুর মজুত রয়েছে ৩ হাজার ২০০ কোটি টনের বেশি। এখন নতুন করে খনিজের অস্তিত্ব মিলেছে।

ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চল অনেক আগে থেকেই ভূসম্পদে ভরপুর। সর্বশেষ ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার বালুতে মূল্যবান, দুষ্প্রাপ্য ও ভারী মিনারেলের উপস্থিতি দেশের জন্য বড় প্রাপ্তি।

আইএমএমএমের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. আবুল কাশেম বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৭৩৫-৮০০ মিলিয়ন টন বালু প্রবাহিত হয়ে থাকে। এ সময় এক-তৃতীয়াংশ বালু নদী অববাহিকায় জমা হয়। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর কাছে নদীর দিক পরিবর্তনের পর থেকেই বালু জমা হতে থাকে, যার পুরুত্ব ৩০ থেকে ৫০ মিটারের বেশি। বালুস্তরের মধ্যে মূল্যবান এসব খনিজ শনাক্ত করা হয়েছে। 

আরও পড়ুন

×