ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

ভাঙা মেরুদণ্ডও ভাঙতে পারেনি তাঁর মনোবল

ভাঙা মেরুদণ্ডও ভাঙতে পারেনি তাঁর মনোবল

মাচাংয়ে শুয়েই যন্ত্রাংশ মেরামত করছেন মাহাবুর রহমান। সম্প্রতি নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার যোগেন্দ্রনগর গ্রামে। ছবি: সমকাল

নাজমুল হাসান, গুরুদাসপুর (নাটোর)

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৪ | ১২:০৯

গ্রামীণ মেঠোপথে চলতে চলতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হবে যে কোনো পথিককে। মেরেকেটে ৬ ফুট দীর্ঘ ও দুই-আড়াই ফুট চওড়া মাচাংয়ের ওপর উবু হয়ে শুয়ে আছেন এক যুবক। হাতে যন্ত্রপাতি। এভাবেই সারাই করছেন ভ্যান, রিকশা, ইজিবাইক ও বাইসাইকেলের নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রাংশ।

সম্প্রতি এ দৃশ্য দেখা যায় যোগেন্দ্রনগর গ্রামে। যে কারিগর যন্ত্রপাতি মেরামত করছিলেন, তাঁর নাম মাহাবুর রহমান। বছর কয়েক আগেও তিনি ছিলেন সুস্থ-সবল আর দশটা মানুষের মতো। স্বাভাবিক জীবন ছিল। কিন্তু এক দুর্ঘটনায় জীবন পথের বাঁক বদলে গেছে। তবু হারতে নারাজ তিনি। 

যোগেন্দ্রনগর গ্রামটি পড়েছে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার বিয়াঘাট ইউনিয়নে। ওই গ্রামের কৃষি শ্রমিক আবদুল ওয়াহাবের (৬২) ছোট ছেলে এই মাহাবুর (৩২)। ওয়াহাবের তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে আবদুল বারেকও বাবার পেশায় আছেন। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে। মাহাবুর ভ্যান, রিকশা, ইজিবাইক ও বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ মেরামতের কাজ শিখেছিলেন আনুমানিক ৮ বছর আগে। যোগেন্দ্রনগর ত্রিমোহিনী মোড়ে দোকানও দিয়েছিলেন। মা-বাবার পাশাপাশি স্ত্রী ও একমাত্র ছেলে নিয়ে মোটামুটি সুখেই চলছিল সংসার। কিন্তু বছর তিনেক আগে গাছ থেকে ডাব পাড়তে গিয়ে পড়ে যান। এতে ভেঙে যায় তাঁর মেরুদণ্ডের হাড়। অভাব-অনটনের সংসার সামলেও বাবা-মা ঢাকার দুটি হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েছেন প্রায় ৭-৮ মাস। চিকিৎসকরা বলেছেন, উন্নত চিকিৎসা করালে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে মাহাবুরের। তবে সেই চিকিৎসা আর করানো হয়নি অর্থাভাবে। বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়েছিলেন কয়েক মাস। 

এই সময়ের মধ্যে আরেক দুর্ঘটনা ঘটে। পড়শি যুবকের সঙ্গে পালিয়ে যান মাহাবুরের স্ত্রী। তবুও জীবন সংগ্রাম থামাননি মাহাবুর। সংসারের হাল না ছেড়ে, অন্যের মতো ভিক্ষাবৃত্তিতে না গিয়ে, নিজের পুরোনো পেশায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

মঙ্গলবার মাহাবুর জানান, কয়েক মাস বিছানায় থাকায় উপার্জন করতে পারেননি। ফলে সংসারের খরচ চালাতে বেগ পাচ্ছিলেন। বাধ্য হয়ে বাড়ির সামনেই নিজের দোকান স্থাপন করেন দুই বছর আগে। সেই থেকে মাচাংয়ে শুয়ে ভ্যান, রিকশা, ইজিবাইক ও বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ মেরামত করছেন। গ্রামের যত চালক এসব যানবাহন চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তারাও বেশ সহযোগিতা করেন। আগে দিনে তাঁর আয় হতো হাজার-বারোশ টাকা, এখন তা নেমে এসেছে ৩০০-৪০০ টাকায়। তবু নিজের উপার্জনে সংসার চালাতে পেরে খুশি মাহাবুর।

একই এলাকার ইজিবাইক চালক কামাল হোসেনের চোখে মাহাবুর অনেক পরিশ্রমী। দুর্ঘটনার পর মানবেতর জীবনযাপন করলেও কারও কাছে হাত পাতেননি। প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়েও মেকানিক হিসেবে আয় করছেন। এ কারণে গ্রামের প্রায় সব চালকই যানবাহনের সমস্যা হলে  তাঁর কাছেই নিয়ে আসেন। গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের সমস্যা মাহাবুর তাঁর অভিজ্ঞতা ও যন্ত্রপাতি দিয়ে সারিয়ে দেন। 

ছেলের এমন পরিণতিতে বুক ফেটে আসে বৃদ্ধ আব্দুল ওয়াহাবের। তবে তাঁরও বয়স হয়েছে। বসতভিটা ছাড়া জমিজমা কিছু নেই। তিনি অন্যের জমিতে কাজ করে উপার্জন করেন। একইভাবে কাজ করে সংসারে সহায়তা করেন বড় ছেলেও। সরকার তাঁর ছোট ছেলেকে প্রতিবন্ধী ভাতা দিলে হয়তো তিনি বাকি জীবন ভালোয় ভালোয় কাটিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করেন ওয়াহাব। 

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, ইতোমধ্যে তাঁর কার্যালয় থেকে মাহাবুরের নামে প্রতিবন্ধী কার্ড ইস্যু হয়েছে। আগামী ঈদুল আজহার আগেই তাঁর মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে সরকারি সহায়তা পৌঁছে যাবে বলে আশা করছেন। 

গুরুদাসপুরের ইউএনও সালমা আকতার এই লড়াকু যুবকের জীবন দেখতে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, খোঁজখবর নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার চেষ্টা করবেন। 

আরও পড়ুন

×