ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

শতাধিক ভবনে সাবাড় ‘নাগিন পাহাড়’

শতাধিক ভবনে সাবাড় ‘নাগিন পাহাড়’

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ এলাকায় রাতের আঁধারে এভাবেই কেটে ফেলা হচ্ছে নাগিন পাহাড়। ছবি: মো. রাশেদ

 সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৪ | ০৬:৪১ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৪ | ১৪:৪২

চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী সড়কের টেক্সটাইল মোড় হয়ে দক্ষিণে গেলেই চন্দ্রনগর গ্রিনভ্যালি আবাসিক এলাকা। পিচঢালা পাহাড়ি পথ ধরে একটু ওপরে উঠলে চন্দ্রনগর কিশোয়ান গলি। ওই গলির মাথায় ‘নাগিন পাহাড়’। ১০ একর আয়তনের এই পাহাড়ের সামান্যই এখন দাঁড়িয়ে আছে, বাকিটা কেটে শেষ।

‘নাগিন পাহাড়’ কাটার অপরাধে পরিবেশ অধিদপ্তর গত ২৯ জানুয়ারি একটি মামলা করে। সেই মামলার আসামি স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই নেতাসহ ১৮ জন। মামলার পরও পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি। পাহাড়টির চারপাশে এখন শতাধিক বহুতল ভবন, গড়ে উঠেছে দুটি আবাসিক এলাকা, নাম গ্রিনভ্যালি।

নাগিন পাহাড়ে বাড়ি কাদের

এই পাহাড়ের পূর্ব-দক্ষিণ পাশে ১২ হাজার ৯৬০ বর্গফুট পাহাড় কেটে ১১ তলা ভবন বানিয়েছে মো. হাবিবউল্লাহ বাহার ও নাসির উদ্দিন গং। পূর্ব-উত্তর পাশে ২ হাজার ৩৫০ বর্গফুট কেটে আট তলা ভবন করেছেন সাইফুল আলম সুমন। পূর্ব-দক্ষিণে ৩ হাজার বর্গফুট কেটে সাত তলা বাড়ি বানিয়েছে মোহাম্মদ ইছা খান গং। একই পাশে ১ হাজার ৫০০ বর্গফুট পাহাড় কেটে নুরুল আলম বানিয়েছেন পাঁচ তলা ভবন। খোরশেদ আলম ওরফে টুকু করেছেন দ্বিতল ভবন। ১ হাজার বর্গফুট পাহাড় কেটে চার তলা ভবন করেছেন শহিদ উল্লাহ। একই পাশে ১ হাজার ৪০০ বর্গফুট পাহাড় কেটে ১৩টি ঘর নির্মাণ করেছেন মোতাহের হোসেন। দক্ষিণ পাশে ১ হাজার ৫০০ বর্গফুট পাহাড় কেটে ১২টি টিনশেড ঘর নির্মাণ করেছেন নুরুল ইসলাম। খালেদ মাহমুদ বাবুল ৫৬/এ প্লটে পাহাড় কেটে গড়ে তুলেছেন জারিয়া বারস টাওয়ার। ৫৫/এ প্লটে শোয়েব ভিলা নির্মাণ করেছেন মো. শোয়েব। জাহাঙ্গীর আলম ৩৫ নম্বর প্লটে গড়ে তুলেছেন গ্রিন হাইট। ৪১ নম্বর প্লটের আবুল কালাম ও রাশেদ গং নির্মাণ করেছে মনোয়ারা ম্যানসন। মনির উদ্দিন ৩ হাজার বর্গফুট জায়গায় ভবন করে নাম দিয়েছেন খাগুতিয়া বিল্ডিং। প্রবাসী মো. মনসুর ৪২ নম্বর প্লটে তিন তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। পাশের প্লটে মো. আমির হোসেন নির্মাণ করেছেন ছয় তলা ভবন।

যেভাবে কাটা হয় পাহাড়

স্থানীয় বাসিন্দা হেফাজুতুর রহমান বলেন, ‘পাহাড় কাটা হচ্ছে মূলত রাতে। পাহাড়ের চূড়া থেকে মাটি কেটে নিচে ফেলা হয়। এর পর ভোরের মধ্যে সেই মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়। কেউ যাতে না দেখে, সে জন্য টিনের বেড়া দেওয়া হয়েছে। কাটা অংশ ঢেকে রাখা হয়েছে পলিথিন দিয়ে।’ তিনি জানান, প্রথমে পাহাড় কেটে সমতল করা হয়। পরে তা বিক্রি হয় প্লট আকারে। একেকটি প্লট দুই থেকে তিন কাঠা পর্যন্ত। প্রতি কাঠার দাম ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা।

মামলায় কাজ হয়নি

নাগিন পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে গ্রিনভ্যালি-১ ও গ্রিনভ্যালি-২ আবাসিক এলাকা। ১৯৯৭ সাল থেকে এখানে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হচ্ছে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর বিষয়টি টের পায় ২০২১ সালে। গ্রিনভ্যালি-১ ও গ্রিনভ্যালি-২ আবাসিক এলাকার ৪৯ বাড়ির মালিককে তখন ৬৪ লাখ ৭৮ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া পাহাড় কাটার জন্য ১০ জনের বিরুদ্ধে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলা হয়। সেই মামলার বিচারকাজ এখনও শেষ হয়নি। এর মধ্যে এলাকাটিতে শতাধিক প্লট তৈরি করা হয়েছে। বেশির ভাগ প্লটে হয়েছে বহুতল ভবন। গ্রিনভ্যালি আবাসিক এলাকা সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম বলেন, ‘এই আবাসিক এলাকায় যে টিলা ছিল, সেটি ভিটায় রূপান্তর হয়েছে। ভবনের নকশাও অনুমোদন হয়েছে নিয়ম মেনে। এখন নতুন করে কেউ পাহাড় কাটলে সেই দায় আমাদের নয়।’

 নেপথ্যে আওয়ামী লীগের দুই নেতা

নাগিন পাহাড় কাটার অপরাধে পরিবেশ অধিদপ্তর গত ২৯ জানুয়ারি একটি মামলা করে। পরিদর্শক মনির হোসেন বাদী হয়ে জালালাবাদ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. বাহার উদ্দিন ও সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শামসুদ্দিনসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগরের জ্যেষ্ঠ রসায়নবিদ জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘গত ২২ এপ্রিল এই মামলার শুনানি ছিল; কিন্তু অভিযুক্তরা কেউ আসেননি। আগের মামলাও নিষ্পত্তি হয়নি।’ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পাহাড় কাটার প্রমাণ মিলেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নাগিন পাহাড় কাটার ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। ঘুরেফিরে একই ব্যক্তিরা আসামি। মামলা করেও তাদের থামানো যাচ্ছে না।’ 

স্থানীয়রা বলছেন, শামসুদ্দিন ও বাহারের নেতৃত্বেই নাগিন পাহাড় কাটা হচ্ছে। বাহারের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালেও পাহাড় কাটার অভিযোগে মামলা হয়। ২০২১ সালে চন্দ্রনগর এলাকায় পাহাড় কাটার অপরাধে শামসুদ্দিন ও বাহারকে ছয় লাখ টাকা করে জরিমানাও করে পরিবেশ অধিদপ্তর। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মো. শামসুদ্দিন সমকালকে বলেন, ‘পাহাড় কেটে কোনো স্থাপনা করিনি। আমার যে ঘর ছিল, সেটি সমতলে। তার পরও পরিবেশ অধিদপ্তর আমার স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এর আগে আমাকে ৬ লাখ টাকা জরিমানাও করে। আমি আসলে ষড়যন্ত্রের শিকার।’ কাউকে পাহাড় কাটতে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না বলেও দাবি করেন তিনি। নিজের নামে পাহাড় কাটার দুটি মামলা থাকার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন এসে হুটহাট মামলা দিয়ে যায়, কারও কথা শোনে না। এ কারণে আসামি হয়েছি।’

জালালাবাদ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহজাদা কাজী মালেক বলেন, ‘শামসুদ্দিন ও বাহার  আমাদের কমিটিতে আছেন। তাদের বিরুদ্ধে পাহাড় কাটার অভিযোগ আছে শুনেছি। কিন্তু কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। তাই ব্যবস্থা নিতে পারছি না। আমরা ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে।’

দায়িত্বশীলরা কী বলেন

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বশর মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, ‘কঠোর অবস্থানে থেকেও পাহাড় কাটা ঠেকানো যাচ্ছে না। এক পাহাড়ে অভিযান চালালে অন্য পাহাড় কাটা হচ্ছে। তবে আমাদের অভিযান অব্যাহত।’ পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক হিল্লোল বিশ্বাস বলেন, ‘পাহাড় কাটার জন্য জরিমানার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলাও হয়েছে। রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের কারণে তারা বেপরোয়া।’ 

বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সঞ্জয় কুমার সিনহা বলেন, ‘পাহাড় কাটা মামলার তদন্ত করছে পরিবেশ অধিদপ্তর। আমরা নতুন করে পাহাড় কাটার কোনো অভিযোগ পাইনি, পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’

এদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পুলিশের সামনেই পাহাড় কাটা হলেও জড়িতদের ধরা হচ্ছে না। আর মূল হোতাদের না ধরে কখনও কখনও শ্রমিকদের গ্রেপ্তার করে আইওয়াশ করা হচ্ছে।’ 

 

আরও পড়ুন

×