ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

চট্টগ্রাম বিভাগে ফল বিশ্লেষণ

ক্ষমতাধর নেতারা ভোটে ধপাস

ক্ষমতাধর নেতারা ভোটে ধপাস

প্রতীকী ছবি

 চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৪ | ০৭:২৭ | আপডেট: ১২ মে ২০২৪ | ০৭:২৮

শেখ মোহাম্মদ আতাউর রহমান। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। পাঁচ মাস আগে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনেও ছিল প্রবল প্রতাপ। ছিলেন ক্ষমতার চূড়ায়। তবে উপজেলা নির্বাচন আসতেই ফুটো হয়ে গেছে সেই ক্ষমতার ফানুস। মিরসরাইয়ে অচিন এক আনকোরা প্রার্থীর কাছে গোহারা হারতে হয়েছে তাঁকে।
শুধু আতাউর রহমানই নন; তাঁর মতো পরাজয়ের তেতো স্বাদ নিতে হয়েছে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ, নোয়াখালীর সুবর্ণচর, কক্সবাজার সদর ও কুতুবদিয়া, কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ ও মেঘনার আওয়ামী লীগের আরও ছয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে। 

নেপথ্যে তিন কারণ

চট্টগ্রাম বিভাগের সাত উপজেলায় শীর্ষ নেতাদের এমন পরাজয়ের নেপথ্যে রয়েছে তিন কারণ। প্রথমত, যে সাত উপজেলায় বড় নেতারা প্রার্থী হয়েছেন, সেখানে স্থানীয় এমপির ‘আশীর্বচন’ ছিল অন্য প্রার্থীর ওপর। এমপির ভোটব্যাংক একটি পক্ষের হয়ে কাজ করায় পরাজিত প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে হেরেছেন। আবার এমপির মতের বাইরে গিয়ে যারা প্রার্থী হয়েছেন, তারা নানা প্রতিকূলতার কারণে সব কেন্দ্রে এজেন্টও দিতে পারেননি। হেভিওয়েট প্রার্থী নির্বাচন করেছেন এমন বেশ কয়েকটি উপজেলায় সরেজমিন গিয়ে তাদের এজেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোথাও ভয়ে কেন্দ্রেই আসেননি এজেন্ট। কোথাও কেন্দ্রে আসার পর এজেন্ট টিকে থাকতে পারেননি। তৃতীয় আরেকটি কারণ হচ্ছে, যারা এমপির ‘সুনজর’ পাননি, তাদের পক্ষে কাজ করেননি দলীয় নেতাকর্মী। এসব কারণে নিজের শক্ত দলীয় পরিচয় থাকার পরও এমপির বিপক্ষে গিয়ে নির্বাচনে সুবিধা করতে পারেননি তারা।

সন্দ্বীপে ধরাশায়ী মাঈনুদ্দিন

সন্দ্বীপে এবারে স্থানীয় এমপি মাহফুজুর রহমান মিতার ‘আশীর্বাদ’ ছিল এস এম আনোয়ার হোসেনের ওপর। জিতেছেনও তিনি। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান মাঈনুদ্দিন মিশন। এর আগে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মিশন। আনোয়ারের প্রায় ৪৮ হাজার ভোটের বিপরীতে মিশন এবার পেয়েছেন মাত্র ২ হাজার ৩০০ ভোট। এমন হার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মাঈনুদ্দিন মিশন মন্তব্য করতে রাজি হননি। 

মিরসরাইয়ে আতাউর

মিরসরাইয়ে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মোহাম্মদ আতাউর রহমানকে হারিয়ে দেন এনায়েত হোসেন নয়ন। কাপ-পিরিচ প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৭০ ভোট। আর ঘোড়া প্রতীকে আতাউর পেয়েছেন ২০ হাজার ৭৬৭ ভোট। মিরসরাইয়ের সাতবারের এমপি সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের এবার ‘সুনজর’ ছিল নয়নের ওপর। এ কারণে প্রথম নির্বাচনেই নয়নের বাজিমাত। আর এমপি ও স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীর কাছ থেকে আশানুরূপ সহযোগিতা না পাওয়ায় সাংগঠনিক বড় পদে থাকার পরও হারেন আতাউর। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আমাকে কে কীভাবে হারিয়েছে, তা মিরসরাইয়ের সবাই জানে। বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না। 

কুতুবদিয়ায় ফরিদুল

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী কুতুবদিয়ায় গোহারা হেরেছেন। তিনি ভোট পেয়েছেন মাত্র ৩ হাজার ৯৬৫। বিজয়ী হানিফ বিন কাশেম পেয়েছেন ২৭ হাজার ২৪৯ ভোট। অন্য প্রার্থী আসহাব উদ্দিন পেয়েছেন ৫ হাজার ৪৩৮ ভোট। এতে তিন প্রার্থীর মধ্যে তৃতীয় হয়েছেন ফরিদুল ইসলাম। অবশ্য ভোটের দু’দিন আগে থেকে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

কক্সবাজার সদরে মুজিবুর

কক্সবাজার সদরে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান পেয়েছেন ২৭ হাজার ৮৩৩ ভোট। বিপরীতে বিজয়ী নুরুল আবছারের বাক্সে পড়েছে ৩৬ হাজার ৬০০ ভোট। ৮ হাজার ৭৬৭ ভোটে হারেন মুজিবুর। অথচ এলাকায় মুজিবুর রহমানের রয়েছে প্রভাব। তবে স্থানীয় এমপি সাইমুম সরওয়ার কমলের ‘সুদৃষ্টি’ পাননি তিনি। এমন হারের কারণ জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বলেন, পৌর মেয়র থাকাকালে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম এবং অবৈধভাবে ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে উপজেলা নির্বাচনে মুজিবুরকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মুজিবুর রহমান বলেন, ভোটে হারিনি, আমি হেরেছি স্থানীয় এমপি ও দলের একটা গ্রুপের ষড়যন্ত্রের কাছে। 

মনোহরগঞ্জে জাকির

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে হেরেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান চেয়ারম্যান জাকির হোসেন। ৭৭ হাজার ১১ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুল মান্নান চৌধুরী। বিপরীতে জাকির পেয়েছেন ১১ হাজার ৬১৭ ভোট। জাকির বলেন, দলের নেতাকর্মীর মধ্যে অনৈক্য এবং ভোটের মাঠে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে না পারায় আমি হেরেছি।

মেঘনাতে রতন শিকদার

কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় পরাজিত হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল্লাহ মিয়া রতন শিকদার। তিনি পেয়েছেন ৮ হাজার ৪০৪ ভোট। বিজয়ী মো. তাজুল ইসলাম তাজ পেয়েছেন ১৮ হাজার ৭০০ ভোট। তাজ উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। রতন শিকদার বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীর বিশাল একটি অংশ তাজুলের পক্ষে কাজ করেছে। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের অধিকাংশ চেয়ারম্যান আমার পক্ষে কাজ না করায় ফল ভালো হয়নি।

সুবর্ণচরে খাইরুল আনম

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এমপি একরামুল করিম চৌধুরীর ছেলে আতাহার ইশরাক সাবাব চৌধুরীর কাছে ৭০৩ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এএইচএম খাইরুল আনম চৌধুরী। নির্বাচনে এমপি প্রভাব বিস্তার করায় হারতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন খাইরুল আনম চৌধুরী।

 

আরও পড়ুন

×