ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

বন্দর উপজেলা নির্বাচন

ওসমান পরিবারের সমর্থনেও কেন তিন প্রার্থীর হার

ওসমান পরিবারের সমর্থনেও কেন তিন প্রার্থীর হার

প্রতীকী ছবি

 শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৪ | ০৭:৩৬

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলা নির্বাচনে ওসমান পরিবারের দুই এমপির প্রবল বিরোধিতার মুখেও বিশাল ভোটে কীভাবে জিতলেন জাতীয় পার্টির নেতা মাকসুদ হোসেন। এ নিয়ে শুধু বন্দর নয়, নারায়ণগঞ্জজুড়েই চলছে আলোচনা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নিরপেক্ষ নির্বাচনের সুযোগ পেয়ে মানুষ ক্ষোভ ঝেড়েছে ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে। চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে যারা হেরেছেন ওসমান পরিবারের সমর্থনই তাদের কাল হয়েছে।

দুটি জনসভায় এমপি সেলিম ওসমান ও তাঁর ভাই এমপি শামীম ওসমান সবচেয়ে বেশি বিষোদ্গার করেছিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান প্রার্থী মাকসুদ হোসেনের বিরুদ্ধে। যদিও সেলিম ওসমান নিজে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য। গত ৩০ এপ্রিল এক সভায় সেলিম ওসমান তাঁর পছন্দের প্রার্থীদের নাম উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমার সহকর্মী রশীদ ভাই (চেয়ারম্যান প্রার্থী) একজন মুক্তিযোদ্ধা। নাসিম ওসমান একজন মুক্তিযোদ্ধা, নাসিম ওসমানের সহকর্মী সানাউল্লাহ সানু (ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী)। আমাদের ছোট শান্তা আমাদের মেয়ের মতো।’ 

গত বুধবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বন্দরে ভোট পড়েছে ৪৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ওসমান পরিবারের সবচেয়ে অপছন্দের প্রার্থী মাকসুদ হোসেন (আনারস) ভোট পান ২৯ হাজার ৮৭৩। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রশিদ পান ১৪ হাজার ৮৩৮ ভোট। তবে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও আবদুর রশিদের চেয়ে ১৫ হাজার ৩৫ ভোট বেশি পেয়েছেন মাকসুদ। নির্বাচনে বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা আতাউর রহমান মুকুল পেয়েছেন ১২ হাজার ৬২২ ভোট।

ভাইস চেয়ারম্যান পদে সেলিম ওসমানের পছন্দের প্রার্থী ছিলেন দু’বারের ভাইস চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টির জেলা কমিটির সভাপতি সানাউল্লাহ সানু (উড়োজাহাজ)। তবে তিনি এবার ভাইস চেয়ারম্যান হতে পারেননি।  তিনি পেয়েছেন ১৭ হাজার ১ ভোট। তবে ১৭ হাজার ৬০৬ ভোট পেয়ে ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন মো. আলমগীর হোসেন (মাইক)। অন্যদিকে ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রথমবার নির্বাচন করা মোশাঈদ রহমান মুকিত (তালা) পেয়েছেন ৮ হাজার ৪০৬ ভোট। মুকিতকে সমর্থন দিয়েছিলেন প্রয়াত এমপি নাসিম ওসমানের স্ত্রী পারভীন ওসমান ও তাঁর ছেলে আজমেরী ওসমান। তারা মুকিতের পক্ষে প্রচারেও অংশ নেন।

তবে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে এমপি সেলিম ওসমানের পছন্দের প্রার্থী ছালিমা হোসেন (ফুটবল) ২৯ হাজার ৪৫৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। আরেকজন সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তারও (কলস) ভালো ভোট পেয়েছেন। তিনি পান ২৬ হাজার ২৮৪ ভোট।  

এমপিরা প্রকাশ্যে প্রচারণায় না থাকলেও তাদের অনুসারীরা আবদুর রশিদ, সানাউল্লাহ সানু ও শান্তার পক্ষে নির্বাচনে কাজ করেছেন।

কেন এই ফলাফল? জেলা খেলাঘরের সভাপতি জহিরুল ইসলাম জহিরের পৈতৃক বাড়ি বন্দরের কলাগাছিয়া ইউনিয়নের চর ঘারমোড়ায়। জহির বলেন, সন্ত্রাস,দুর্বৃত্তায়নের বিপক্ষে মানুষ রায় দিয়েছে। নিরপেক্ষ নির্বাচনের সুযোগ পেয়ে মানুষ ক্ষোভ ঝেড়েছে ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে।

বন্দরের অবিচল রাজবাড়ি সামাজিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আতিক মানিক বলেন, ওসমান পরিবার পেশিশক্তির মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। নিজের বা পারিবারিক নিরাপত্তার কথা ভেবে মানুষ তাদের মিছিল, সমাবেশে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু তাদের যে মানুষ পছন্দ করে না, এই নির্বাচনে এটা প্রমাণিত হয়েছে। যারা হেরেছে, ওসমান পরিবারের সমর্থনই তাদের কাল হয়েছে।

বন্দরের মুসাপুর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আবদুল মান্নান বলেন, নিরপেক্ষ নির্বাচনের সুযোগ পেয়ে মানুষ যোগ্য ব্যক্তিদের ভোট দিয়েছে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, গত পাঁচ বছর উপজেলা চেয়ারম্যান থাকলেও আবদুর রশিদ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করেননি। আর নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ছিল না। ফলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বেশির ভাগ তাঁর পক্ষে ছিল না।

এ ব্যাপারে এমপি শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা বলেন, আবদুর রশিদ টাকার কাছে হেরেছেন। রাজাকারের সন্তান মাকসুদ হোসেন প্রচুর টাকা বিলি করেছেন, যেটা আবদুর রশিদের  পক্ষে সম্ভব হয়নি। আর ভাইস চেয়ারম্যান পদে যিনি নির্বাচিত হয়েছেন, সেই আলমগীরও আওয়ামী লীগ কর্মী বলে দাবি করেন খোকন সাহা।

এ ব্যাপারে এমপি সেলিম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি সানাউল্লাহ সানু বলেন, ষড়যন্ত্রের কারণে রশিদ ভাই আর আমি ফেল করেছি। আওয়ামী লীগের একটা অংশ গোপনে বিরোধীদের পক্ষে কাজ করেছে। নির্বাচনে ৩ হাজার ৮৯৯টি ভোট বাতিল হয়েছে। এটি নজিরবিহীন। আর ভাইস চেয়ারম্যান পদে জাতীয় পার্টির আরেকজন প্রার্থী থাকায় ভোট ভাগ হয়ে গেছে। এসব কারণে আমরা ফেল করেছি।

আরও পড়ুন

×