ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪

মানুষের মুখ

কত জন এল গেল ‘সাঈদ ভাই’ রয়ে গেল

কত জন এল গেল ‘সাঈদ ভাই’ রয়ে গেল

দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে আলাওল হলের পাশে দোকান করেন ‘সাঈদ ভাই’। অভাবী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে খাবার খাওয়ান তিনি। ছবি: সমকাল

 এস এম মাহফুজ আহমেদ, চবি প্রদায়ক

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৪ | ১৫:৪৮ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৪ | ১৪:৩৯

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের শিক্ষার্থী কৌশিক রায় (ছদ্মনাম )। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক সময় অনাহারেই কাটিয়ে দিতে হয় তাকে। ক্ষুধার্ত অবস্থায় একদিন বসেছিলেন ‘সাঈদ ভাইয়ের’ দোকানের এক কোণে। তিনি কোনোভাবে জানতে পারেন ছেলেটি ক্ষুধার্ত।  

তখন সাঈদ ভাই তাকে বিনামূল্যে দোকান থেকে খাবার খাওয়ান। এরপর মাঝেমধ্যে প্রায়ই ছেলেটিকে বিনামূল্যে খাবার দিয়েছেন তিনি। তার মতো আরো অনেক শিক্ষার্থীকে এভাবে দোকান থেকে বিনামূল্যে খাবার খাওয়ান। অথচ তার নিজের ঘরে অভাব, কিন্তু ক্যাম্পাসের অভাবীদের ভরসা হলেন সাঈদ ভাই। বলছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ৩০ বছর ধরে চা বিক্রি করা সবার সাঈদ ভাইয়ের কথা। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে কত শত শিক্ষার্থী আসে যায়, কিন্তু সাঈদ ভাই রয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাওল হল সংলগ্ন রাস্তার পাশে একটি ছোট্ট টং দোকানের চা বিক্রেতা সাঈদ ভাই।  সন্ধ্যা নামলেই দোকানে ভিড়  জমতে থাকে শিক্ষার্থীদের। আড্ডা আর গানে মেতে উঠে তার দোকান । চা ছাড়াও তার দোকানে কলা, পাউরুটি, সিঙ্গারা পাওয়া যায়। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে একই জায়গায় চা বিক্রি করে আসছেন তিনি। তার মতো আরো অনেক দোকানদার এখানে এলেও কেউ বেশিদিন টিকে থাকতে পারেননি । দীর্ঘ এই সময়ে অসংখ্য শিক্ষার্থীর সাথে ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছেন তিনি, মায়ায় পড়ে গেছেন অপরূপ ক্যাম্পাসের।  অনেক গরিব শিক্ষার্থী রয়েছেন যাদের তিনি বিনা টাকায় এক বেলা কিংবা দুই বেলা চা–নাস্তা খাওয়ান। 

শিক্ষার্থীরা জানান, দোকানে আসা সকল শিক্ষার্থীর সঙ্গে তিনি খুবই সুন্দর ও আন্তরিক ভাষায় কথা বলেন, যা শিক্ষার্থীদেরকে মুগ্ধ করে। তাকে চেনেন না এমন ছাত্র–ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব রয়েছে। সকাল–সন্ধ্যা কিংবা রাত সবসময় শিক্ষার্থীদের সেবা করার চেষ্টা করেন । এমন অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন যাদের একদিন সাইদ ভাইয়ের দোকানে না আসলে দিন কাটে না। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান হল ও আলাওল হলের প্রায় শিক্ষার্থী দিনে একবার হলেও যান তার দোকানে। অনেকে শিক্ষার্থী রয়েছেন যারা নাস্তা খাওয়ার পর বাকি খেয়ে চলে যান কিন্তু সেই বাকির টাকা আর পাওয়া হয় না সাঈদ ভাইয়ের। জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম এই ছোট্ট চায়ের দোকানটি হলেও, তারপরও কারো প্রতি কোনো অভিযোগ নেই তার। সরল মনে সবাইকে বিশ্বাস করেন, ভালোবাসেন। 

শিক্ষার্থী গিয়াস উদ্দীন বলেন, ‘আমি নিয়মিত এই দোকানে চা খেতে আসি। সাঈদ ভাই আমাদের সাথে খুব সুন্দরভাবে কথা বলেন। যা দেখে আমরা মুগ্ধ হই। সব থেকে বড়  কথা, আমাদের কাছে মাঝে মাঝে টাকা না থাকলে বিনামূল্যে তিনি আমাদের নাস্তা করান। এই আন্তরিকতা সবার কাছে নেই।’

আরেক শিক্ষার্থী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘সাঈদ ভাই একজন ভালো মনের মানুষ । তাকে আমরা সবসময় হাসিখুশি দেখি , দেখে মনে হয় তিনিই পৃথিবীর সব থেকে সুখী মানুষ । সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে তিনি দারুণভাবে মিশে যান। তাছাড়া ভালো চা–সিঙ্গারা বানানোর ফলে তার দোকানে দিনে একবার হলেও আসা হয় খাওয়ার জন্য। অভাব থাকার পরও তিনি যে উদারতার পরিচয় দেন তা অনেক মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার ।’

চা দোকানদার সাঈদ বলেন, ‘তিন দশক ধরে চায়ের দোকানে কাজ করার সুবাদে ভালো–মন্দ অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। সবার সঙ্গে আমি ভালো আচরণ করি যার কারণে এখন পর্যন্ত কারো কাছ থেকে কটু কথা আমাকে শুনতে হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি হওয়ায় এখানেই রয়ে গেছি দীর্ঘ ৩০ বছর। আমার দোকানে আসা বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ভালো মনের মানুষ। এমন অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল। তাদেরকে আমি বিনামূল্যে দোকান থেকে চা নাস্তা দেই, এতে আমার নিজেরও অনেক ভালো লাগে। বাকি জীবনটা আমি এভাবেই কাটিয়ে দিতে চাই।’

আরও পড়ুন

×