ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪

৪৫ বছরে এসএসসি দিয়েও মেয়ের চেয়ে ভালো ফল মায়ের

৪৫ বছরে এসএসসি দিয়েও মেয়ের চেয়ে ভালো ফল মায়ের

ছবি- সমকাল

নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৪ | ২১:৪০

পরিবারের চাপে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বসতে হয়েছিল বিয়ের পিঁড়িতে। এর পর ৩০ বছর ধরে টানছেন সংসারের ঘানি। এর মধ্যে ছেলে-মেয়েকে বড় করে পাঠিয়েছেন স্কুল ও কলেজে। কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি নিজের প্রবল আগ্রহ কমেনি একটুকুও। সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে বাসায় বসে পড়তেন নবম শ্রেণির পাঠ্যবইসহ বিভিন্ন বই। ৪৫ বছর বয়সে এসএসসি পাস করে সেই নারী এবার স্থাপন করেছেন উজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত। 

লড়াকু এ গৃহবধূর নাম নূরুন্নাহার বেগম। তিনি নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নের কাঠাঁলকান্দি গ্রামের ব্যবসায়ী আফসর মিয়ার স্ত্রী। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে ২০২৪ সালের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি পেয়েছেন ৪ দশমিক ৫৪ জিপিএ।

এ বছর তাঁর মেয়ে নাসরিন আক্তারও দিয়েছিল এসএসসি। স্থানীয় চাতলপাড় ওয়াজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগ থেকে নাসরিন পেয়েছে ২ দশমিক ৬৭ জিপিএ। এখানে মেয়ের চেয়ে বেশি জিপিএ পেয়ে বাজিমাত করেছেন নূরুন্নাহার।

রোববার এসএসসির ফল প্রকাশের পর উচ্ছ্বসিত নূরুন্নাহার সমকালকে বলেন, ছোটবেলায় খুব ইচ্ছা ছিল পড়ালেখা করে মানুষের মতো মানুষ হবো। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে দেশের নারীদের জন্য ভালো কিছু করব। কিন্তু পরিবারের চাপে খুব ছোট থাকতে বিয়ে হয়ে যায়। এর পর দুই ছেলে-মেয়ে আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় পড়ালেখা আর করা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু মনের মধ্যে ইচ্ছাটা সব সময়ই ছিল। এর পর নিজের একান্ত ইচ্ছা আর স্বামী-সন্তানের অনুপ্রেরণায় দুই বছর আগে চাতলপাড় কারিগরি বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হই। 

এই বয়সে লেখাপড়া নিয়ে তিনি বলেন, পড়ালেখার কোনো বয়স নেই। ইচ্ছা থাকলে যে কোনো বয়সে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লেখাপড়া করতে চাই। দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করতে চাই।

লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজনীতিতেও উজ্জ্বল নূরুন্নাহার। তিনি চাতলপাড় ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত নারী ইউপি সদস্য। শিক্ষায় নারীদের এগিয়ে নিতে চান জানিয়ে এ জনপ্রতিনিধি বলেন, আমি চাই হাওরপাড়ের নারীদের এগিয়ে নিতে। যেসব নারী পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে পড়ালেখা করতে পারেন না, তাদের প্রতি অনুরোধ– সরকার বিনা টাকায় পড়ালেখা করার সব ব্যবস্থা করেছে। আর পরিবার থেকে অল্প বয়সে বিয়ের চাপ দিলে অবশ্যই প্রতিবাদ করতে হবে। সুবিধাবঞ্চিত নারীদের নিয়ে প্রয়োজনে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। 

নূরুন্নাহারের স্বামী আফসর মিয়া বলেন, আমার স্ত্রীর পড়ালেখার প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখেছি। তাই সুযোগ করে মেয়ের সঙ্গে নবম শ্রেণিতে ভর্তি করে দিয়েছিলাম। এখন দেখি আমার মেয়ের চেয়ে স্ত্রী ভালো রেজাল্ট করেছে। 

চাতলপাড় ইউপি চেয়ারম্যান রফিক মিয়া বলেন, তিনি আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের একজন সদস্য। তাঁর এই সাফল্যে আমরা গর্বিত। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি একজন আদর্শ।

নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইমরানুল হক ভূঁইয়া সমকালকে বলেন, মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে সব কিছুই অর্জন করা সম্ভব। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য নূরুন্নাহার সেই উদাহরণ। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মানিত করা হবে। 

আরও পড়ুন

×