ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

ঈদের আনন্দ ফিরেছে ২৩ নাবিকের ঘরে

বরণ করতে কেউ রেঁধেছেন ঈদের সেমাই, কেউ বানিয়েছেন কেক

ঈদের আনন্দ ফিরেছে ২৩ নাবিকের ঘরে

দুই রকমের কেক বানিয়েছেন নুর উদ্দিনের স্ত্রী ফেরদৌস

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৪ | ০৭:০১

‘ঈদ শেষ হয়েছে অনেক আগে। কিন্তু এবারের ঈদ বিষাদময় ছিল আমাদের কাছে। স্বামী জলদস্যুদের হাতে জিন্মি থাকলে ঈদের আনন্দ তো আর থাকে না মনে। আমাদের ঘরে ঈদ হবে মঙ্গলবার। আমরা তাই সেমাই রেঁধেছি। নতুন কাপড় পড়বো। রেঁধেছি গরুর মাংসের কালো ভুনা। পুঁটি মাছের ফ্রাইও করেছি। এসব খুব পছন্দ করে আতিকুল্লাহ’- স্বামী আতিকুল্লাহকে বরণ করতে এমন পরিকল্পনার কথা গড় গড় করে বললেন তার স্ত্রী মিনা আজমিন। জিন্মি ঘটনার ৬৩ দিন পর বাড়ি ফেরা ২৩ নাবিকের একজন আতিকুল্লাহ খান। তিনি এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের প্রধান কর্মকর্তা।
 
শুধু আতিকুল্লাহর স্ত্রী নন; জিন্মি দশা থেকে মুক্ত হয়ে আসা সেই ২৩ নাবিকের অন্য স্বজনরাও নিয়েছেন নানা পরিকল্পনা। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় কুতুবদিয়া চ্যানেলে নোঙর করেছে ২৩ নাবিকসহ জিন্মি হওয়া সেই এমভি আবদুল্লাহ জাহাজ। আজ মঙ্গলবার বিকেলে সদরঘাট জেটিতে তাদের বরণ করবেন স্বজনরা। নাবিকরা তীরে আসলে জেটিতে গিয়েই তাদের বরণ করবেন স্বজনদের অনেকে।
 
কেএসআরএম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী মেহেরুল করিম বলেন, ‘গত ২৮ এপ্রিল দুবাই থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা জাহাজটি সোমবার সন্ধ্যা ছয়টায় কুতুবদিয়া চ্যানেলে নোঙর করেছে। মঙ্গলবার বিকেলে জাহাজে থাকা নাবিকদের সদরঘাটের জেটিতে নামাবো আমরা। সেখান থেকে তারা যার যার বাড়িতে ফিরে যাবে। স্বজনদের কেউ যদি সদরঘাটে আসতে চায় আমরা বারণ করবো না। তবে বেশি মানুষ সেখানে ভিড় না করাটাই ভালো হবে।’
 
যেভাবে মুক্ত হলো নাবিকরা

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএমওএ) সভাপতি ক্যাপ্টেন মো. আনাম চৌধুরী বলেন, গত ১২ মার্চ দুপুর দেড়টার দিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগর থেকে এমভি আবদুল্লাহকে জিন্মি করে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। জাহাজটি মোজাম্বিক থেকে ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে দুবাই যাচ্ছিল। এটি ছিনতাইয়ের পর সোমালিয়ার উত্তরপূর্ব উপকূলের গারাকাদে নোঙ্গর করেছিল। গত ১৩ এপ্রিল ভোর ৩টায় সোমালিয়ান দস্যুদের কাছ থেকে ২৩ নাবিকসহ মুক্তি পায় এমভি আবদুল্লাহ জাহাজ। এরপর জাহাজটি পণ্য খালাস করতে আরব আমিরাতে যায়। সেখান থেকে পণ্য বোঝাই করে এখন চট্টগ্রামে ফিরে এসেছে এমভি আবদুল্লাহ জাহাজটি। 

দুই রকমের কেক বানিয়েছেন নুর উদ্দিনের স্ত্রী ফেরদৌস

জিন্মি দশা থেকে মুক্ত হওয়া নাবিকদের স্বজনদের সঙ্গে প্রথমবারের মত দেখা হচ্ছে মঙ্গলবার। এই দিনকে স্মরণীয় করে রাখতে তাই নানাভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন স্বজনরা। স্বামী নুরউদ্দিন দেশে ফেরার দিন কি করবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে জেনারেল স্টুয়ার্ড নুরউদ্দিনের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘গরুর মাংস খুব পছন্দ করেন নুরউদ্দিন। পছন্দ করে আমার হাতে বানানো কেকও। এই দুই খাবারের অনেক রকম মেন্যু থাকবে মঙ্গলবার রাতে। রান্না করবো বিভিন্ন পদের সেমাই ও পায়েস। এবারের ঈদে সেমাইও রান্না করিনি আমরা। ও ঘরে আসলেই ঈদের আনন্দ করবো। কয়েকদিন বিশ্রাম নিয়ে করবো ঈদের শপিংও।’ 

সাজ্জাদ ফেরায় বাজবে বিয়ের সানাই

অন্যরকম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে জাহাজের আরেক নাবিক সাজ্জাদের পরিবার। নিকটাত্মীয় নুপুরের সঙ্গে আকদ অনুষ্ঠান করেই এমভি আবদুল্লাহ জাহাজে উঠেছিল নাবিক সাজ্জাদ। কথা ছিল দুবাই থেকে জাহাজে ফেরার পর হবে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান। কিন্তু সোমালিয়ার জলদস্যুদের হাতে জিন্মি হওয়ায় সব ছক এলোমেলা হয়ে যায় সাজ্জাদ ও নুপুরের। উদ্বেগ উৎকন্ঠায় কাটতে থাকে তাদের দিন। সব উৎকন্ঠার অবসান হচ্ছে কাল। সাজ্জাদ ঘরে ফিরবে কাল। আর সে ফিরলেই বাজবে বিয়ের সানাই। এরই মধ্যে বিয়ের অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রেখেছে দুই পরিবারের স্বজনরা। পছন্দ করে রেখেছে বিয়ের ক্লাবও। এখন দিনক্ষণ চুড়ান্ত করেই শুভ অনুষ্ঠানটা শেষ করতে চায় তারা।

সাজ্জাদের মা শামসাদ বেগম বলেন, ‘শুনেছি মঙ্গলবার ঘরে ফিরবে সাজ্জাদ। অনেকদিন পর আমার ছেলে আমাদের বুকে ফিরবে তাতেই শোকরিয়া আমার আর কিছু দরকার নাই। সে খবর শুনে আমার মনটা শান্ত হয়ে গেল। এবার বাড়ী ফিরলেই জমকালো আয়োজনে ছেলের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে ফেলবো।’ 

সাজ্জাদের বড় ভাই মোস্তাক হোসেন বলেন, সাজ্জাদকে রিসিভ করতে আমরা স্ব-পরিবারে শহর থেকে আনতে যাবো। অনেকদিনের অপেক্ষার পর ভাই আমাদের মাঝে ফিরবে এতে পরিবারের সবাই অনেক খুশি।

ঈদের আনন্দ নেমেছে শিমুলদের ঘরে

জাহাজের অয়েল কর্মকর্তা শামসুদ্দিন শিমুলের স্ত্রী ফারজানা সুলতানা বলেন, সোমবার সন্ধ্যায় ভিডিও কলে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। তার বাড়ি ফেরার কথা শুনে সকলে খুবই আনন্দিত। ঈদের আনন্দ বিরাজ করছে বাড়িতে। সাগরে জলদস্যুরদের হাতে জিম্মি দশার দীর্ঘদিনের কঠিন মুহুর্তের পর তিনি আমাদের মাঝে ফিরবেন এটা ভাবতেও আমাদের খুব আনন্দ অনুভব হচ্ছে। এই আনন্দ দিনের সময়টুকু জীবনে মধ্যে স্মরণীয় করে রাখতে বিশেষ আয়োজনের চিন্তাভাবনা আছে আমাদের।

প্রসঙ্গত, এর আগে একই মালিক গ্রুপের এমভি জাহান মনিকে নাবিকসহ ২০১০ সালে জিম্মি করেছিল জলদস্যুরা। সেবারও মুক্তিপণ দিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়। এসআর শিপিংয়ের অধীনে মোট ২৪টি জাহাজের মধ্যে সর্বশেষ যুক্ত করা হয় এমভি আবদুল্লাহকে। ২০১৬ সালে তৈরি এই বাল্ক ক্যারিয়ারটির দৈর্ঘ্য ১৮৯ দশমিক ৯৩ মিটার এবং প্রস্থ ৩২ দশমিক ২৬ মিটার। ড্রাফট ১১ মিটারের কিছু বেশি। গত বছর জাহাজটি এসআর শিপিং কিনে নেওয়ার আগে এটির নাম ছিল গোল্ডেন হক। মালিকানা পরিবর্তনের পর জাহাজের নামও পরিবর্তন করা হয়। নতুন নাম হয় এমভি আবদুল্লাহ।

আরও পড়ুন

×