ঢাকা রবিবার, ২৬ মে ২০২৪

সেই মৃত্যুকূপেই ফের বসতি!

সেই মৃত্যুকূপেই ফের বসতি!

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম ও সত্রং চাকমা, রাঙামাটি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১২ জুন ২০২০ | ১৪:৫১

মিমের বয়স এখন ৭ বছর। তার বোন সুমাইয়ার বয়স ৫। তিন বছর আগে এই দিনেই পাহাড়ধসে জীবনের সবচেয়ে আপন দুই স্বজনকে হারিয়েছিল তারা। হারিয়েছিল বাবা ও মাকে। তখন মিমের বয়স ছিল ৪। আর সুমাইয়ার বয়স মাত্র দুই। মিম এখন পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। আর স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তার ছোট বোন সুমাইয়া।

ফুফু মিনারার হাত ধরা সুমাইয়ার সঙ্গে গতকাল শুক্রবার কথা হয় রাঙামাটির সেই রূপনগর পাহাড়ের ভাঁজে। 'বাবা-মায়ের কথা মনে আছে?' জানতে চাইলে ছোট্ট সুমাইয়া উত্তর দেয়, 'আছে'। এরপর 'তারা কোথায়?' জানতে চাইলেই নিশ্চুপ হয়ে যায় সে।

রূপনগরের যেখানে দাঁড়িয়ে সুমাইয়া কথা বলছিল, তার পাশেই বাবা সালাহউদ্দিন ও মা রহিমা বেগমকে চাপা দিয়ে মেরেছিল পাহাড়। বাবা-মা হারানো সেই পাহাড়ের ভাঁজেই আবার নতুন বসতি গড়েছে সুমাইয়ার ফুফু মিনারা বেগম। শুধু মিনারা বেগম নন, ২০১৭ সালের ১৩ জুন ১৬০ জনের প্রাণহানির পর একই স্থানে ফের নতুন বসতি গড়েছে নিহতদের বেঁচে থাকা স্বজনরা। মৃত্যুকূপ জেনেও চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারের শতাধিক পাহাড়ে ফের আবাস করেছে লাখো প্রাণ।

স্বজন হারানো ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী মানুষদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের সুপারিশ করেছিল তদন্ত কমিটি। সেই সুপারিশ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল জাতীয় সংসদে। হয়েছিল সিদ্ধান্তও। কিন্তু বাস্তবে আলোর মুখ দেখেনি স্থায়ী পুনর্বাসনের উদ্যোগ। তাই প্রতি বছর বর্ষার আগে লোক দেখানো কিছু তোড়জোড় করে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। পাহাড়ের পাদদেশে চালায় অভিযান। করে উচ্ছেদ। চালিয়ে যায় মাইকিংও। কিন্তু ফলোআপ আর হয় না কঠোরভাবে। তাই উচ্ছেদের কিছুদিন পর ফের বসতি ওঠে পাহাড়ের ভাঁজে। আবারও ফিরে আসে মৃত্যুঝুঁকি।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বলেন, 'পাহাড়ে যাতে কেউ ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসতি না করে সে জন্য নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছি। গ্যাস, বিদ্যুৎ, ওয়াসাসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থাকে সংযোগ না দেওয়ার অনুরোধও করেছি। এটি নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করছে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বাধীন পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার লোক আছে এতে। প্রশাসন তাদের গাইডলাইন অনুযায়ী যে কোনো সাপোর্ট দিতে প্রস্তুত রয়েছে।'

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ বলেন, 'রাঙামাটিতে ২০১৭ সালের পর ২০১৮ ও ২০১৯ সালেও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এ জন্য এবার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত এক মাস ধরে পাহাড়ধসের বিষয়ে জনগণকে সচেতন করছি। সাইনবোর্ড ও লিফলেট বিতরণ করেছি। রাঙামাটি পৌরসভা ও প্রতিটি উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ বসত পাহাড়গুলো চিহ্নিতও করেছি। ভারি বর্ষণের সময় পাদদেশে বসবাসকারীদের যাতে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া যায়, সে জন্য কাজ শুরু করেছি। শুধু রাঙামাটি পৌরসভাতেই ২৬টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্ণয় করেছি। এ ছাড়া সব প্রাইমারি বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজকে প্রস্তুত রাখতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিকে চিঠি দিয়েছি।'

সাইনবোর্ড দিয়েই দায় শেষ : 'ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা : বসবাস ও স্থাপনা নির্মাণ করা নিষেধ' লালকালিতে এমন সাইনবোর্ড ঝুলছে রাঙামাটির ভেদভেদি, রূপনগর ও রেডিও স্টেশন এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ে। পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ঠেকাতে জেলা প্রশাসন এমন সাইনবোর্ড লাগিয়েছে পশ্চিম মুসলিম পাড়া এলাকার পাহাড়েও। কিন্তু যেখানে এ সাইনবোর্ড আছে তার ১০০ গজের মধ্যেই পাহাড়ের ভাঁজে নতুন করে ঘর তুলেছে স্বজন হারানো বাসিন্দারা।

কথা হয় রূপনগরের বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর, মো. আবদুল মতিন, নুরুল কবির ও মরিয়ম বেগমের সঙ্গে। তারা জানান, জেলা প্রশাসন বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছে। আর বলেছেন বেশি বৃষ্টিপাত হলে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে। একই এলাকার বাসিন্দা দোকানদার মো. ইসলাম জানান, এই এলাকায় পাহাড়ধসের সময় তার এক আত্মীয়সহ তিনজন মারা গেছেন। তাদের দু'জনের লাশ পাওয়া যায়নি। যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফের এখানেই বসবাস করছেন তারা। তবে সরকার যদি তাদের থাকার জন্য সমতল জায়গায় ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে এই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আর বসবাস করবেন না।

পাহাড়ধসে বাবা-মা হারানো শিশু মিম ও সুমাইয়ার দেখাশোনা করছেন তাদের ফুফু মিনারা বেগম। তিনি বলেন, 'সেই ঘটনার পর সুমাইয়া আর মিমের খচর চালানোর দায়িত্ব নেয় রাঙামাটির জেলা প্রশাসন। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান খরচ দিয়েছেনও। তিনি বদলি হওয়ার পর নতুন জেলা প্রশাসক এসে কয়েক মাস খরচ দিলেও বর্তমানে কোনো খরচ পাচ্ছি না। ওদের নিয়ে খুব কষ্টে কাটছে দিন।'

বাস্তবায়ন হয়নি তদন্ত কমিটির সুপারিশও : ২০১৭ সালের এ দিনে পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম, রাঙামাটিসহ পাঁচ জেলায় ১৬০ জনের প্রাণ হারানোর পর তদন্ত কমিটি হয়েছিল প্রতিটি জেলায়। দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ও আলাদাভাবে গঠন করেছিল উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি। এই কমিটি ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের স্থায়ীভাবে পুর্নবাসন, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা, পাহাড়ের ভাঁজে বসতি স্থাপনকারীদের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন না দেওয়া এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে আরও কঠোরভাবে তাদের মনিটরিং জোরদার করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু গত তিন বছরে কোনো সিদ্ধান্তই স্থায়ীভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি স্থানীয় প্রশাসন।

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি প্রতি বর্ষার আগে একবার মিটিং করে কয়েক দিন মাইকিং করে। চট্টগ্রামে এমন মিটিং হবে ১৪ জুন। এরপর উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। হবে মাইকিং। কিন্তু কঠোর এ মনিটরিং চলে না সারা বছর। তাই মৃত্যুফাঁদে বসতির সংখ্যা বাড়ছে প্রতি বছর। পাঁচ জেলায় এখন ঝুঁকিপূর্ণভাবে এমন বসবাসকারীর সংখ্যা লাখেরও বেশি।

আরও পড়ুন

×